খোলা জানালা

পণ্য ও ভোক্তাঃ পারস্পরিক সম্পর্ক

বর্তমান বাজারজাতকরণের মূল বিষয় হচ্ছে “ভোক্তাই রাজা”। ভোক্তাকে সন্তুষ্ট না করতে পারলে পণ্য বাজারে টিকিয়ে রাখা বেশ কঠিন ব্যাপার। ভোক্তারাই প্রতিষ্ঠানের স্বরূপ ও বাজারজাতকরণের প্রকৃতি নির্ধারণ করে থাকে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের পণ্যের চাহিদা ও ভোগের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নির্দিষ্ট পণ্য অর্জনের লক্ষ্যে মানুষের কর্ম প্রচেষ্টার একটি বিরাট অংশ এর সাথে নিয়োজিত রয়েছে। যার কারণে ভোক্তা ও পণ্যের মধ্যে পারস্পরিক এক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সম্পর্কে ভোক্তা ও পণ্য বিক্রেতার আচরণ একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ভোক্তার আচরণের বিষয় এক প্রভাষক এবং লেখক ড. স্টিভেন জে. স্কিনার বলেন, “কনসিউমার বিহেভিয়ার ইজ দ্যা এ্যাকশন এন্ড ডিসিসন প্রসেস অফ পিপল হু পারচেজ গুডস এন্ড সার্ভিসেস ফর পার্সোনাল কন্সাম্পশন”। যে সকল পণ্যের সেবা অথবা ধারণাকে সম্ভাব্য ক্রেতা নতুন বলে মনে করে তাকে নতুন পণ্য বলা হয়।

অন্যদিকে, যে সকল প্রকৃত ও সম্ভাব্য ব্যবহারকারী জনসাধারণ বাজারের পণ্য, সেবা বা ধারণা ব্যবহার করে তাদের কার্যাবলীকে ভোক্তার আচরণ বলে। অর্থাৎ, একজন ভোক্তা তার ভোক্তা কার্যক্রম সম্পন্ন (বাজারজাত থেকে শুরু করে ভোগ করা পর্যন্ত) করতে যা যা করে, তাই ভোক্তার আচরণ। অন্যভাবে বললে, পণ্য বা সামগ্রী বা সেবাকর্ম ক্রয়ের সময় একজন ক্রেতা যে সকল কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে সে সকল কাজের সাথে সম্পর্কিত সকল আচরণই ভোক্তার আচরণ। পণ্য ও ভোক্তা হলো এমন দুটি জিনিস, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একে উপরের উপর নির্ভরশীল। শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নয় বরং বিশ্ব-অর্থনীতিতে এর প্রভাব ব্যাপক। পণ্য, সেবা, ক্রেতা এবং ভোক্তা; এই চারটি বিষয় একে অপরের সাথে সম্পর্কিত এবং নির্ভরশীল। তাই “পণ্য ও ভোক্তাঃ পারস্পরিক সম্পর্ক” নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করতে অত্র চারটি ব্যাপারে আমাদের জানতে হবে এবং পূর্ণাঙ্গ ধারণা রাখতে হবে। উল্লেখ্য বিষয়ের ব্যাপকতা অনেক। এটির সম্পর্কে পূর্ণাং ধারণা পেতে হলে এর গভীরে যেতে হবে। যেমন- বাজারজাতকরণ, বিজ্ঞাপন, সরকার-ব্যাবসায়িক ইত্যাদি। আমার এই প্রতিবেদনে আমি পণ্য, সেবা, ক্রেতা এবং ভোক্তা; এই ৪ বিষয়ে বিশ্লেষণ করবো এবং “পণ্য ও ভোক্তাঃ পারস্পরিক সম্পর্ক”  ব্যাপারটি সমাধান করবো।

কোনো বস্তুর মধ্যে যদি স্পর্শনীয় অথবা অস্পর্শনীয় বা উপলব্ধিযোগ্য গুণ থাকে ও তা মানুষের অভাবপূরণ বা সন্তুষ্টি বিধানে সমর্থ হয় এবং বিক্রেতা কর্তৃক বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে তা ক্রেতাদের নিকট বিক্রয়ের নিমিত্তে উপস্থাপন করা হয় তবে তাকে পণ্য বলে। আমরা বলতে পারি, যে বস্তুর মধ্যে দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান গুণ থাকে যা মানুষের অভাব পূরণ বা সন্তুষ্টি বিধানে সমর্থ হয় এবং বিক্রেতা কর্তৃক বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে তা বাড়তি উপযোগ সৃষ্টিসহ ক্রেতা সাধারণের উদ্দেশ্যে উপস্থাপিত হয় তাই পণ্য। অর্থাৎ, পণ্য হলো এমন কিছু যা মানুষের প্রয়োজন অ অভাব মেটাতে পারে বা সক্ষম। ১৯৩০ সালের পণ্য বিক্রয় আইনে ফিলিপ কোটলার বলেন পণ্যের বৈশিষ্ট্য ৩ টি। যথা- ১) পণ্যের মূল বিক্রয় বা গুণ, ২) পণ্যের বাহ্যিক অবয়ব, এবং ৩) অন্তর্নিহিত গুণ। আবার পণ্য ২ ধরণের হয়ে থাকে। যথা-

১। দৃশ্যমান পণ্য – যে সমস্ত পণ্য উপভোগের সময় আমরা দেখতে পারি এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীন, দুইভাবেই অনুভব করতে পারি, তাকে দৃশ্যমান পণ্য বলে। যেমন- চাল, ডাল, লবণ ইত্যাদি।

২। অদৃশ্যমান পণ্য – যে সমস্ত পণ্য উপভোগের সময় আমরা দেখতে পারি এবং শুধুমাত্র অভ্যন্তরীনভাবে অনুভব করতে পারি; অর্থাৎ, বাহ্যিকভাবে অনুভব করতে পারিনা, তাকে অদৃশ্যমান পণ্য বলে। যেমন- শিক্ষা, বাসস্থান ইত্যাদি।

অর্থাৎ, আমরা যে দৈনন্দিন জীবনে নানারকম পণ্যের সেবা ভোগ করি তা এক দৈনন্দিন প্রক্রিয়া বা কার্যক্রম। তবে হ্যাঁ, পণ্য এবং সেবার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এদুটি কার্যক্রম এক নয়। দুটি দুই আঙ্গিকের। দুটির ব্যবহার দুই ধরনের। সেবা বলতে এমন কার্যক্রমকে বোঝায় যা অদৃশ্যমান, অস্পর্শনীয় এবং গ্রাহকের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য লেন্দেনে প্রধান লক্ষ্য বস্তু অর্পিত হয় কিন্তু মালিকানা স্বত্ব সৃষ্টি করে না। সেবার ৪টি প্রধান বিশিষ্ট রয়েছে। যথা- ১) অস্পর্শনীয়, ২) অবিচ্ছেদ্য, ৩) বৈসাদৃশ্যতা, এবং ৪) নশ্বরতা। অর্থনীতিতে, একটি সেবা হলো এমন একটি লেনদেন যাতে কোনো শারীরিক পণ্য বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রেতার কাছে স্থানান্তরিত হয় না তবে মানুষ তা উপভোগ করে। আর সেবা বিপণন হলো এমন এক বিপণন, যা মূলত এমন কিছু বাজারজাত করে, যা অদৃশ্য, অস্পৃশ্য অথচ শনাক্ত করা যায় এবং এর ব্যাবহারে উপযোগিতা নিঃশেষ হয় বা উপকার পাওয়া যায়।

বাজারজাতকারী থেকে আলাদা করা যায় না এমন অদৃশ্য যেকোনো কিছুই সেবা বাজারজাতকরণের দৃষ্টিকোণ থেকে সেবা হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ, সেবাগুলির বেশিরভাগ অমূল্য এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে, শারীরিক আকারে দেখা যায় না। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সেবাগুলো কারো জন্য কিছু করার একটি ব্যাবস্থাকে নির্দেশ করে। সেবা এমন একটি ব্যবস্থা যার কোনো নির্দিষ্ট মালিক নেই। মানে সেবার মালিকানা কোনোভাবেই হস্তান্তরযোগ্য নয়। যেমন, আমার বাবা-মা সরকারকে কর দিচ্ছে। সরকার আমাদের সেই করের জন্য নানাপ্রকার সেবা দিচ্ছে যেমন- পুলিশ সেবা, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি। আমরা তা উপভোগ করতে পারি কিন্তু আমরা তার মালিকানা নিতে পারিনা। অন্যভাবে, সহজ করে বললে আমি একটি বাসের টিকেট কিনলাম। বাসে করে আমরাআমাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিব ও যেয়ে পৌছাবো। কিন্তু এর মানে এই নয় যে বাসটি সম্পূর্ণ আমার বা আমি বাসটির মালিক। অর্থাৎ, সেবা মালিকানা যোগ্য না হলেও পণ্য মালিকানাযোগ্য। কারণ, আমরা যারা ক্রেতা বা উপভোগকারী তারা পণ্য কিনলে তার মালিকানা পেয়ে যাই। যেমন- চাল, ডাল, চিপস। এসব বস্তাদি কিনলে এটির শেষ পর্যন্ত আমরা এটির মালিক ও এটিকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যবহার করতে পারি। অপরদিকে, সেবাসমূহ আমরা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যবহার করতে পারি না। সেটি ব্যবহারের কিছু নিয়ম-কানুন বা আইন আছে। যেগুলো অত্র সেবার উপর নির্ভরশীল। এক-এক সেবার ব্যবহার এক-এক রকম। ঠিক তেমনই সেবার মূল্যায়ন কঠিন ও কিছুটা ভিন্নতর যেখানে পণ্যের মূল্যায়ন সহজ। সেবার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাক্তি বা সংস্থা যারা একই সেবা প্রদান করে থাকে, তা বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে প্রদান করে থাকে। এসব বিবেচনা করে দেখলে একটি সেবা ভালো বা খারাপ তা নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ, সেখানে পূর্ণাঙ কোনো মাপকাঠি নেই। বিভিন্ন বিশ্লেষকদের মতে স্পষ্ট হয় যে পন্যগুলি এমন পণ্য যা বাস্তব এবং মানুষ যেগুলি হাতে ধরতে পারে অথবা অন্তত শারীরিকভাবে দেখতে পারেন, তা হলো সে সমস্ত পণ্য যা বাজারে বিক্রি করা হয় এবং আমরা যারা ক্রেতা তা ক্রয় করি।

এদিকে ভেবে দেখলে মজার কথা হচ্ছে, পণ্য ও সেবা এমনকি ক্রেতা ও ভোক্তা সবই একে অপরের উপর নির্ভরশীল; অর্থাৎ, একে অপরকে ছাড়া অচল। যেমন ধরা যাক একজন ব্যাক্তি একটি এসি বা এয়ারকুলার বা এয়ার কন্ডিশনার কিনবেন। আপনি প্রথমে যেখানে কিনতে যাবেন সে হবে এটির প্রথম মালিক। পরবরতীতে আপনি সেটি কিনলে সেটির সম্পূর্ণ মালিকানা আপনার উপর স্থানান্তরিত হবে। আবার বেশ কিছুদিন পর আপনি সেটি মেরামত করাতে দোকানে যাবেন। তখন আপনাকে অপরপক্ষ সেটি ঠিক করার মাধ্যমে সেবা প্রদান করবে। পুনরায়, কিছু সময় পর আপনি সেটি বিক্রি করতে চাইলে যিনি কিনতে আসবেন তিনি হবেন ক্রেতা আর আপনি হবেন দাতা। সে সেই এসিটি কিনলে এসিটির সম্পূর্ণ মালিকানা আপনার নাম হতে তার নামে স্থানান্তরিত হবে এবং পরবর্তীতে তার এসির জন্য সেবা প্রদানে আপনি ব্যবহারে আসতেও পারেন আবার নাও আসতে পারেন। মূলত এই ঘটনা থেকে আমরা যা বুঝলাম তা হলো, এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া যা একটি সাইকেল এর চাকার মতো ঘূর্ণায়মান।

সত্যি কথা বলতে গেলে পণ্য এবং সেবা, এই দুই এর মধ্যকার পার্থক্য অর্থনীতিতে আলোচনা করা মৌলিক বিষয়গুলির একটি এবং অন্যতম। একজন বাবা তার পরিবারের বাজেট প্রতি মাসে তাদের খরচের উপর লক্ষ্য করে করেন। একটি পরিবারের খরচ নানা দিকে থাকে। তবে এই খরচ নির্ভর করে আয় এর উপর। আয় আর ব্যয়; দুটি এমন এক ব্যাবস্থা যেখানে দুটিএ দুটির উপর নির্ভরশীল। আসলে আমরা আমাদের জীবনেই সকলে একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল। পার্থক্য হচ্ছে একটাই সেটি হলো এক-এক জনের প্রেক্ষাপট এক-এক রকম। কিন্তু প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও ব্যাবস্থাদি অন্যের উপর নির্ভরশীল। আমার আয় যদি হয় ১০ টাকা, তবে আমি সেখান থেকে ১১ টাকা ব্যয় করতে পারবো না। আমাকে ১০ টাকাই অথবা তার কম ব্যয় করতে হবে। আমাদের আসলে ব্যয় কোথায়? আমাদের মূলত ব্যয় হয় খাদ্য, বাসস্থান এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য যা দরকার তাতে। আমাদের মধ্যে অনেকেই বাসা ভাড়া করে থাকে। তাদের আয় থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ যায় এই বাসা ভাড়ায়। এরপর বাকি আয় থেকে কিছু অর্থ সেই বাসার বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পানির বিল প্রভৃতি যায় সরকারের খাতে। এদিকে বর্তমান যুগের সকল আধুনিক বাসায় আবার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও উচ্চমানের নিরাপত্তা ব্যাবহার করা হয়ে থাকে। তাদের আবার আলাদা বিল প্রতি মাসে দিতে হয় ইউটিলিটি বিল, দারোয়ানের বেতন ইত্যাদি। তার জন্য আবার ভালো সংখ্যক অর্থ আয় থেকে ব্যয় খাতে চলে যায়। আবার এলাকা নির্বিশেষে সোসাইটির চাদার কথা আর নাই বলি। যাতায়াত মূলত বাসে, রিকশায় অথবা সিএনজি ভাড়া এতেও প্রচুর অর্থ চলে যায়। আর গাড়ি থাকলে তো মাশাল্লাহ। এরপর যে অর্থ বাকি থাকে তা থেকে খাদ্যের যোগান দিতে অনেক পরিবারের হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় পরিবারের অনেকের নানা সমস্যা, চিকিৎসাসহ নানা হাত-খরচ তো আছেই। এটি গেল নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা। এবার আসি উচ্চ-মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের কথায়। এসবের সাথে তাদের থাকে বিরাট বিরাট গাড়ি আর অন্যান্য খরচ। তাদের মূল ব্যয় হয় বিলাসিতার কারণে। বিলাসিতা এমন এক জিনিস যা চোখের পলকে বিপুল টাকা নিয়ে চলে যাবে। এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো এক পরিবার আলু কিনে বাজার থেকে অথবা ভ্যান থেকে ২৫ টাকায় অপরদিকে আরেক পরিবার আলু কিনে “শপিং মল” বা উচ্চভিলাষি দোকান থেকে ১২৫ টাকায়। “হাস্যকর”। তবে হ্যাঁ এই পণ্য বা সেবার সাথে ক্রেতাদের মূল সম্পর্ক হলো “চাহিদা”। চাহিদা আছে দেখেই দ্রব্যাদি আছে। মানুষের চাহিদায় যা নাই, তা বাজারেও নাই। এটাই সায়েন্স। আমি এক চিপস কিনি ২৫০ টাকা দিয়ে, আবার আমিই অন্য চিপস কিনি ১০ টাকায় বা ১৫ টাকায়। এই যে দ্রব্যের দামের যে তারতম্য এটি ঘটেছে শুধুমাত্র একটি কারণে; আর তা হলো বিলাসিতা। মনে করেন, বাজারে একটি চকোলেট খুব চলছে। হঠাৎ মানুষ সেই চকোলেট আর কিনছে না। তখন আস্তে আস্তে সেই চকোলেটটি আর বাজারে খুজে পাও্য়া যাবে না। কারণ, সেটির প্রতি মানুষের চাহিদা কমে গেছে বা নেই। এই চাহিদা নেই দেখে সেই পণ্যও নেই।ভোক্তা হলেন একজন ব্যক্তি যে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের জন্য একটি পণ্য বা সেবা উপভোগ (ক্রয়) করেন। ভোক্তা হচ্ছেন এক বা একাধিক মানুষ, যারা কোনো পণ্যের চূড়ান্ত ভোগ সম্পন্ন করে। ভোক্তা একটি পণ্যের শেষ ব্যবহার নিশ্চিত করে থাকেন এবং সাধারণত ব্যবহারের ফলে একটি পণ্যের পরবর্তী পর্যায়ের কোনো উন্নয়ন ঘটান না। অর্থনীতির ভাষায় যে ব্যাক্তি ভোগ করে তিনিই ভোক্তা। কোনো অবাধ সহজলভ্য দ্রব্য ছাড়া অন্য সব দ্রব্য ভোগ করার জন্য যে ব্যক্তি অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত থাকে তাকে ভোক্তা বলে। ভোক্তারা একটি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভোক্তা চাহিদা ছাড়া, উৎপাদকদের উৎপাদনের মূল প্রেরণার একটি চাবিকাঠি হারাবে তা হলো ভোক্তাদের কাছে বিক্রি। ভোক্তা আবার বিতরণের শৃঙ্খলের একটি অংশ। ভোক্তার সন্তুষ্টি

বিধানের বিবেচ্য বিষয়-

১। চাহিদানু্যায়ী পণ্য ও সেবা সরবরাহ

২। পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন

৩। পণ্যের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ

৪। প্রকৃতি অনুযায়ী পণ্য নিশ্চিতকরণ

৬। পণ্য ক্রয়ের সিদ্ধান্তে সাহায্য করা ইত্যাদি।

ক্রেতা হলেন একজন ব্যাক্তি যে ব্যক্তিগতভাবে ব্যাবহারের জন্য একটি পণ্য বা সেবা ক্রয় করেন। ক্রেতা বলতে মূলত এমন মানুষকে বোঝানো হয় যে নির্দিষ্ট সম্পদের বিনিময়ে বিপরীত পক্ষ হতে দুই জনের মতামতের ভিত্তিতে সুবিধা গ্রহণ করে। যখন কোনো মানুষ কিছু সম্পদের ক্রেতার ভূমিকা পালন করে তখন ক্রেতার সংগাতে এক নতুন অর্থ যোগ হয়। বলা যায় যে, ক্রেতা বলতে সেই মানুষকে বোঝানো হয় যে সমাপনী পণ্য ক্রয় করে, সাধারণত পনঃবিক্রয়ের উদ্যোশ্যে, উৎপাদনের, সরকারের বা প্রতিষ্ঠানের জন্য। আবার একজন ব্যাক্তি যে পণ্য তৈরীর উদ্যেশ্যে জিনিসপত্র ক্রয় করে তাকে সাধারণত ক্রয় এজেন্ট বলা হয়। বিক্রয় ব্যাবস্থাপনায় ক্রেতা এমন এক সত্তা যা কোনোকিছু ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নেয়। একজন ক্রেতার সাধারণ দায়িত্ব হলো সর্বোচ্চ মানের পণ্য সর্বনিম্ন দামের সাহায্যে ক্রয় করা। এটার গবেষণা, দর প্রস্তাব এবং প্রাপ্ত তথ্য মূল্যায়ন এর সম্ভব। একজন ক্রেতা সাধারণত ৩ ধরনের উদ্দেশ্যে পণ্য ক্রয় করে। যথা-

১। বিক্রয় করে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে

২। মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে পরবর্তী উৎপাদনের কাজে ব্যাবহারের উদ্দেশ্যে

৩। ব্যক্তির বা পারিবারিক ভোগ বা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে

ভোক্তা এমন একজন হতে পারে যিনি পণ্য ক্রয় করে ভোগ করবে অথবা এমনও হতে পারে যে পণ্য ক্রয় না করে ভোগ করবে। মূলত আমরা ভোক্তা বলতে কোনো কিছুকে সম্পূর্ণরূপে উপভোগ করাকেই বোঝায়; যাতে কোনো প্রকার বাধ্য-বাধকতা থাকেনা। ভোক্তা চাইলে অত্র পণ্যটিকে যেকোনো ভাবে ব্যবহার করতে পারেন। ভোক্তা হলো আমার-আপনার মতো মানুষরা। ভোক্তা তখন ভোক্তা হয় যখন একজন মানুষ কিছু ক্রয় করেন। ক্রয় করেন যিনি তাকে ক্রেতা বলা হয়। অর্থাৎ, ক্রেতা থেকে ভোক্তা আসে। ভোক্তা ও ক্রেতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমরা অনেক সময় ভোক্তা এবং ক্রেতাকে মিলিয়ে ফেলি। কিন্তু, ক্রেতা এবং ভোক্তা এক নয়। ক্রেতা নানা কারণে একটি পণ্য বা সেবা ক্রয় করে থাকেন। ক্রেতার মধ্যে অনেকে ভোক্তা হয়। আবার অনেকে নিজের ব্যাবসার কাজে সেটিকে ব্যাবহার করেন। তখন তিনি সেই পণ্যটি একজন বিক্রেতা হিসেবে বিক্রি করেন ভোক্তার কাছে। এটি একটি সাইকেল এর চাকার মত ঘূর্ণায়মান। ক্রেতার থেকে একটি পণ্য ভোক্তায় স্থানান্তরিত হয়। এক কথায় বলতে গেলে ক্রেতা ছাড়া ভোক্তা অচল তেমনই ভোক্তা ছাড়া ক্রেতা অচল। দুইই একে অপরের সঙ্গে পরস্পর সম্পর্কিত। এছাড়া, ভোক্তার চাহিদা থাকে পণ্যের উপরে। আর সেই চাহিদা মেটান একজন ক্রেতা। আমি এখান ক্রেতা বলতে দ্বিতীয় সারির বিক্রেতা তথা প্রথম সারির ক্রেতাকে বুঝিয়েছি। যা কেবলই মাত্র এক সিন্ডিকেট। অর্থাৎ, এক কথায় বলা যায় যে আমরা ভোগ করতে চাইলে সরাসরি কোম্পানিতে চাহিদা দিতে পারি অপরদিকে দ্বিতীয় সারির বিক্রেতা তথা প্রথম সারির ক্রেতাকে চাহিদা দিতে পারি। ঠিক যেটি আমি উপিরে পণ্যের ব্যাপারে বলেছি।

পণ্য ও ভোক্তাঃ পারস্পরিক মনস্তত্ত্ব – ভোক্তা ও পণ্যের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে উঠার পেছনে অনেক বিষয় বস্তু কাজ করে। একটি নতুন পণ্য বাজারে আসার পরই শুরু হয় দর গ্রহণ প্রক্রিয়া। প্রকৃতপক্ষে ভোক্তা কর্তৃক নতুন পণ্য গ্রহণ প্রক্রিয়াটি একটি মানসিক প্রক্রিয়া । একটি পণ্য আবিষ্কারের প্রথম খবর পাওয়া থেকে শুরু করে চূড়ান্ত গ্রহণ পর্যন্ত একজন ভোক্তাকে অনেক স্তর অতিক্রম করতে হয়। এছাড়াও, পণ্যর মূল্য, প্রাথমিক খরচ, দৈনন্দিন পরিচালনার খরচ, ঝুকি ও অনিশ্চয়তা, ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সামাজিক স্বীকৃতি ইত্যাদি বিষয়সমূহ পণ্য ভোগের হারের উপর ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। উপরে আমরা এই দুই বিষয়ে পূর্ণাং আলোচনা করেছি। যা থেকে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক একদম পরিষ্কার। অর্থাৎ, একে অপরের উপর নির্ভরশীলতা। বিভিন্ন প্রকার পণ্য আমরা ভোগ করে থাকি। পণ্যের শ্রেণীভাগের উপর ভিত্তি করে যদি বলি-

১) সেবা পণ্য – টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি।

২) আবশ্যক পণ্য – চাল, ডাল, মুড়ি, কাগজ ইত্যাদি।

৩) জরুরী পণ্য – ঔষধ, খুচরা যন্ত্রাংশ, গাড়ির তেল ইত্যাদি।

৪) সৌখিন পণ্য – অলংকার, দামি আসবাবপত্র,, গিফট সামগ্রী ইত্যাদি।

৫) বিশিষ্ট পণ্য – মূল্যবান ক্যামেরা, আকর্ষণীয় বস্তু, দামী কলম ইত্যাদি।

৬) লোভনীয় পণ্য – ম্যাগাজিন, খেলনা, ফুলদানি ইত্যাদি।

এছাড়াও, ভোক্তারা বাজার থেকে নিজস্ব প্রয়োজনের তাগিদে দ্রব্য ও সেবা সমূহ ক্রয় করে থাকে। আমরা জানি, যারা পণ্য বা সেবা ভোগ করে তাদেরকে ভোক্তা বলা হয়। সেই অর্থে পণ্য ও ভোক্তার মধ্যে একটি সম্পর্ক স্থাপিত হয়। পণ্য ক্রয়ের পূর্ণ ভোক্তাকে অনেকগুলো বিষয় সম্পর্কে অবহিত হতে হয়; যেমনঃ বিক্রয় পরিকল্পনা, পণ্য তথ্য সংগ্রহ, পণ্য বিকল্প মূল্যায়ন, মার্কেটিং মিশ্রণের উপাদান্সমূহ ইত্যাদি বিষয়সমূহের সমন্বয়ে করে ভোক্তাকে পণ্য ক্রয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এসকল বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমেই পণ্য ও ভোক্তার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। পণ্য গ্রহণের হার নির্ভর করে ক্রেতাদের মূল্যবোধ এবং অভিজ্ঞতার সাথে নতুন পণ্যটি কতটুকূ সামঞ্জস্যপূর্ণ তার উপর। নতুন পণ্যের ব্যবহার পদ্ধতি সহজ হলে তা ভোক্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং জটিল হলে পণ্য গ্রহণের হার কম হবে। যদি নতুন পণ্যটি পর্যবেক্ষণযোগ্য ও অন্যের কাছে বর্ণনার উপযোগী হয় তাহলে ভোক্তা উক্ত পণ্যের সুবিধা সম্পর্কে খুব সহজে অবগত হবে এবং পণ্যটির বিক্রয় দ্রুত গতিতে হবে। বাজারজাতকারী বিভিন্ন মাধ্যমে ভোক্তার অবগতি সৃষ্টি করতে পারে। আবার, বিক্রয়কর্মীর মাধ্যমে অবগতি সৃষ্টি করতে পারে। সত্য কথা হলো পণ্যের ব্যাপারে ব্যাপক প্রচার চালালে ক্রেতাদের আগ্রহ সৃষ্টি হয়, যা একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। পণ্যের জন্য যদি পরীক্ষামূলক মহড়ার ব্যবস্থা করা হয় তাহলে ক্রেতাদের মাঝে খুব সহজেই ভালো মনোভাব তৈরী করা যায়। একটি পণ্য যত সহজে ব্যবহৃত হবে, যেমন ল্যাপটপে ব্যবহার করা যাচ্ছে কিন্তু কম্পিউটারে যাচ্ছে না এমন জটিলতা না থাকলে, তত তাড়াতাড়ি তা ভোক্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং বিক্রি ভালো হবে। ভোক্তার ক্রয়সিদ্ধান্ত সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল। ভোক্তার আচরণ বিশ্লেষণের সময় বাজারজাতকারীর সর্বচ্চো সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ভোক্তাদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই বাজারজাতকারী পণ্য সরবরাহ করে থাকে। ভোক্তার সাথে দৃশ্যমান সম্পর্ক স্থাপনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো “পণ্য” বা “দ্রব্যসামগ্রী”।

পণ্যের দাম সাধারণত বিএসটিআই কর্তৃক ঠিক করা হয়ে থাকে। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা পণ্য ব্যবহার করে থাকি। একজন ভোক্তা এবং পণ্যের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে একজন বিক্রেতা বা উদ্যোক্তা। একজন ভোক্তা এবং একটি পন্যের মধ্যকার সম্পর্কটি ভালোও হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। সম্পর্কটি ভালো হয় কখন? যখন কিনা পণ্যটি ভালো থাকে এবং পণ্য থেকে আমরা যে সুবিধা পাই তা যদি ভালো থাকে। এক কথায় আমাদের মনের পছন্দ বা ভালো লাগ্লে সেই পণ্যের সাথে সম্পর্কটি দৃঢ় হয়। এটি একটি জীবনমুখী ব্যাপার। ভালো লাগা এবং সুবিধা; এ দুইটি জিনিস ঠিক থাকলেই হলো। মানুষ বড়ই স্বার্থপর। নিজের ভালো আগে ভাবে। তবে এ বিষয়টি মজার হয় তখন যখন ব্যাপারটি নেতিবাচক হয়। অর্থাৎ, যখন সম্পর্কটি খারাপ হয়। সম্পর্কটি খারাপ হয় কখন? সম্পর্কটি খারাপ হয় তখন যখন পণ্যটি ভালো হয় না, অর্থাৎ, যখন পণ্যটি থেকে সুবিধা আসে না। এটি আসলে পণ্যের মধ্যে সমস্যা থাকলে বেশি দেখা যায়। আবার পণ্যের মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ চলে গেলে পণ্য ও সেই পণ্যের কোম্পানির সাথে যেন এক সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে। এসময় দেখা যায় মানুষ সেই কোম্পানির দ্রব্যাদি ব্যাবহার করা থেকে বিরত থাকেন। আর এই সম্পর্কের বিচ্ছেদ দুটি কারণে হতে পারে, তা হলো – ১। ইচ্ছাকৃত কারণে ২। অনিচ্ছাকৃত কারণে। ইচ্ছাকৃত কারণ বলতে যা বোঝানো হয় তা হলো, যখন পণ্যের কোম্পানি বা বিক্রেতা ইচ্ছা করে মেয়াদ উত্তীর্ণ বা নষ্ট পণ্য ভোক্তার কাছে সরবরাহ করে। এটি মূলত কোম্পানির জন্য হতে পারে আবার বিক্রেতার জন্য হতে পারে। অনিচ্ছাকৃত কারণ বলতে যা বোঝায় তা হলো, যখন পণ্যের কোম্পানি বা বিক্রেতা ইচ্ছা না করে বা অজান্তে মেয়াদ উত্তীর্ণ বা নষ্ট পণ্য ভোক্তার কাছে সরবরাহ করে। আর তাই ভোক্তাদের উচিত সবসময় পণ্য কেনার সময় দেখে কেনার এবং পণ্য নষ্ট হলে তা সম্পর্কে কোম্পানিকে ও বিক্রেতাকে জানানো; প্রয়োজনে পুলিশ এবং ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরকে জানানো। ভোক্তার অধিকার সুনিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ পাশকরে এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর গঠন করা হয়। ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের একটি দায়িত্ব ও কর্তব্য। নিম্নে এমন কিছু আইন, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে কিছু আলচনা করা হলো – 

ভোক্তা অধিকার আইন ও ভোক্তা অধিকার দিবস – ১৯৬২ সালের ১৫ মার্চ সাবেক মার্কিন যুক্ত্রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি কংগ্রেসে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে বক্তৃতা দেন। তিনি ভোক্তাদের চারটি মৌলিক অধিকার সম্পর্কে আলোকপাত করেন, যা পরবর্তীতে ভোক্তা অধিকার আইন নামে পরিচিতি পায়। কংগ্রেসে তিনি বলেন, “ভোক্তাদের সংজ্ঞায় আমরা সকলেই অন্তর্ভুক্ত। তাঁরা সবচেয়ে বৃহৎ অর্থনৈতিক জোট হিসেবে প্রভাববিস্তারকারী এবং সকল ধরনের সরকারি ও ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রভাবান্বিত হয়ে থাকেন। যদিও তাঁরাই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ জোট … কিন্তু তাদের কথা প্রায়শঃই শোনা হয় না”। কেনেডি’র বর্ণিত চারটি মৌলিক অধিকার হচ্ছে –

১) নিরাপত্তার অধিকার

২) তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার

৩) পছন্দের অধিকার

৪) অভিযোগ প্রদানের অধিকার

পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘের মাধ্যমে জাতিসংঘ ভোক্তা অধিকার রক্ষার নীতিমালায় কেনেডি বর্ণিত চারটি মৌলিক অধিকারকে আরো বিস্তৃত করে অতিরিক্ত আরো আটটি মৌলিক অধিকার সংযুক্ত করা হয়। এরপর থেকেই কনজুমার্স ইন্টারন্যাশনাল এসকল অধিকারকে সনদে অন্তর্ভুক্ত করে। কেনেডির ভাষণের দিনকে স্মরণীয় করে রাখতেই মূলত ১৫ মার্চকে বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং যা বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়ে থাকে।

কনজুমার্স ইন্টারন্যাশনাল – কনজুমার্স ইন্টারন্যাশনাল হচ্ছে ভোক্তাদের বৈশ্বিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। কনজুমার্স ইন্টারন্যাশনাল কে সংক্ষেপে সিআই বলা হয়। ভোক্তাদের অধিকার সুনিশ্চিত ও তা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এই সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে। এই সংগঠনটি পরিচালিত হয় যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে। হল্যান্ডভিত্তিক কনজুম্যান্টবন্ড সংস্থার সভাপতি এলিজাবেথ শেডি এবং ইংল্যান্ডের কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশনের  প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ক্যাস্পার ব্রুক – উভয়ের চিন্তাধারার ফসলরূপে ইন্টারন্যাশনাল অর্গ্যানাইজেশন অব কনজুমার্স ইউনিয়ন্‌স (আইওসিইউ) গঠিত হয়। দু’জনে ভোক্তা ও পণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের জন্যে বৈশ্বিক সংগঠন গঠনের লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রস্তাবনা করেন, যাতে উভয় বিষয়কে কাছাকাছি নিয়ে আসা হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কনজুমার্স ইউনিয়নের পরিচালক কোলস্টন ওয়ার্ন বৈশ্বিক সংগঠন গঠনের লক্ষ্যে $১০,০০০ ডলার বরাদ্দ দেয়। ১৯৬০ সালের জানুয়ারি মাসে অত্র তিনটি সংগঠন একত্রিত হয়ে “দ্যা হেগ” প্রথম আন্তর্জাতিক ভোক্তা পরীক্ষণ বিষয়ক সম্মেলন আহ্বান করে। ১৪টি দেশের ১৭টি ভোক্তা সংগঠনের ৩৪জন ব্যক্তি ঐ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। তারা পণ্যের মান ও ইন্টারন্যাশনাল অর্গ্যানাইজেশন অব কনজুমার্স ইউনিয়ন্‌স (আইওসিইউ) নামীয় আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন, যা পরবর্তীতে বেলজিয়ামের টেস্ট-আচাটস এবং অস্ট্রেলিয়ার চয়েজ সংগঠন উপরিউক্ত তিন দেশের সাথে মিলিত হয়ে আরো তিনটি সম্মেলন আয়োজন করে। সংস্থাটি ইন্টারন্যাশনাল অর্গ্যানাইজেশন অব কনজুমার্স ইউনিয়ন্‌স (আইওসিইউ) নামে ১৯৬০ সালের ১ এপ্রিল লন্ডনে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়।পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে কনজুমার্স ইন্টারন্যাশনাল রাখা হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১১৫টি দেশের ২২০টিরও অধিক সংস্থা এর সদস্য, যার প্রায় দু্ই-তৃতীয়াংশ সদস্যই উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ সদস্যরা শিল্পোন্নত রাষ্ট্রের। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভোক্তাদের আন্দোলন এবং  ভোক্তাদের নিরাপত্তা প্রদানে সংস্থাটি সহযোগিতা করে থাকে। এটি মূলত একটি চ্যারিটি ফাউন্ডেশন যার চ্যারিটি নং ১১২২১৫৫। শুরুতে জাতীয় পর্যায়ে ভোক্তা সংঘগুলো এর সাথে কাজ করে, যার ফলে এ সংঘগুলো একত্রিত হয়ে সংস্থাটিকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং খুব দ্রুত প্রধান মুখপত্র হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে ভোক্তা আন্দোলনে – উৎপাদন এবং খাদ্যের মান; স্বাস্থ্য ও রোগীর অধিকার; পরিবেশ এবং ধ্বংস থেকে রক্ষা; এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সাধারণ জনগণের উপযোগীতা বিষয়ে কাজ করে।

বাংলাদেশ জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাংলাদেশ জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর একটি আধা-বিচারিক সরকারি সংস্থা যা পণ্য ও পরিষেবার উপর ভোক্তাদের অভিযোগ গ্রহণ ও তা নিষ্পত্তি এবং ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণ করার অভিলক্ষ্যে কাজ করে থাকে, যার সদর দপ্তর ঢাকায় অবস্থিত এবং প্রতিটি বিভাগে এর স্থানীয় দপ্তর রয়েছে। “ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯” এর মাধ্যমে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ২০০৯ সালে বর্তমান সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়।  গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এই আইনের অধীনেই জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ – ও প্রতিষ্ঠিত হয়।  এটি সারা বাংলাদেশের জনগণের ভোক্তা অধিকার সুনিশ্চিতে কাজ করে। এই দপ্তরের প্রধান হচ্ছেন একজন মহাপরিচালক যিনি বাংলাদেশ সরকারের সচিব পদমর্যাদার অধিকারী। বর্তমানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সচিব বাবলু কুমার সাহা। ভোক্তাগণ যেকোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিকট অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। অধিদপ্তর তদন্ত করে যদি অভিযোগ প্রমাণিত করতে পারে সেক্ষেত্রে উক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করা হবে এবং উল্লেখ্য জরিমানার ২৫ শতাংশ ভোক্তাকে প্রদান করা হবে। ক্ষতিগ্রস্থ ভোক্তা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অধিদপ্তরের সুব্যক্ত অনুমতি ছাড়া কোনো আইনানু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না, যা ভোক্তাদের সমর্থনকারী দলের সমালোচনার মুখে পড়ে যে “আইন প্রকৃতপক্ষে ভোক্তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে”।

DIRECTORATE OF NATIONAL CONSUMER RIGHTS PROTECTION

এছাড়াও বাংলাদেশ ভোক্তা সমিতি ভোক্তাদের সুবিধা ও অসুবিধায় কাজ করে থাকে। বাংলাদেশ ভোক্তা সমিতিকে সংক্ষেপে ক্যাব হিসেবে ডাকা হয়। ১৯৭৮ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংগঠনের পরিকাঠামো কিছুটা যুক্তরাজ্য ও যুক্ত্রাষ্ট্রের ভোক্তা সাধারণের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করা সংগঠনগুলির মতো। মূলত এই প্রতিষ্ঠানটি ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করে এবং ভোক্তার কর্তব্য সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে। বাংলাদেশে এই সংগঠনটি প্রধানত দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত ভোক্তা-সাধারণের স্বার্থ রক্ষায় নিজেদের মূল দায়িত্ব হিসেবে বেছে নিয়েছে। এই সংগঠনটির কার্যক্রম সারা দেশে সংগঠিত হয়ে থাকে। সংগঠনটি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও সেবামূলক পণ্যের বাজারদর নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যবেক্ষণ করে থাকে। শুধু তাই নয়, সংগঠনটি ভোক্তাদের বিভিন্ন মাধ্যমে বাজারের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে থাকে। তাছাড়া, বাজারদর যেন সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে না যায় সেটিও তারা নিশ্চিত করে। এজন্যে সস্থাটির একটি বাজার পর্যবেক্ষণ শাখা আছে। যার কর্মকর্তারা নিয়মিত বিভিন্ন বাজারের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ও সংবাদ-মাধ্যমের সাহায্যে ভোক্তাদের কাছে তার বিভিন্ন খবরাখবর দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত ১২টি ক্ষতিকর ফরমালিন ও খাদ্যে ভেজাল দেয়ার বিরুদ্ধে এই সংগঠন “নোংরা এক ডজন” নামে প্রচার অভিযান চালায়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, দেশে কীটনাশক বিক্রি ও বাজারজাতকরণে রাষ্ট্রীয় কোনো নীতিমালা ছিল না। ফলে এই সংগঠনের উদ্যোগে এবং আন্দোলনের কারণে সরকার এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে। পরবর্তীতে যা গেজেট আকারে পাশ করা হয় এবং গেজেট পরিপত্রের মাধ্যমে সাধারণ জনগণদের অবহিত করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো –

১) ভোক্তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে তাদের সচেতনতা বাড়ানো।

২) শোষণের নানা দিক নিয়ে ভোক্তাদেরকে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ও ভোগ্যপণ্যে ক্রয়ে প্রতিরক্ষার জ্ঞানের পাশাপাশি সহায়তা করা।

৩) ভোক্তাদের নানা সমস্যার ওপর আলোকপাত করা ও তাদের কল্যাণে উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সমিতি, দল, প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠনের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বিকশিত করা।

৪) আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সংস্থা/সংগঠনের সাথে ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ বিষয়ে সভা-সেমিনার এবং তথ্য আদান প্রদান করা।

৫) বাংলাদেশের সকল জেলা ও থানায পর্যায়ে শাখা ও ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ দল গঠন করা।

৬) ভোক্তাসংক্রান্ত নানা বিষয় ও সমস্যা সম্পর্কে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা।

ক্যাব ভোক্তা সাধারণের কাছে পণ্য ও ভোক্তার অধিকার বিষয়ক তথ্য প্রতিনিয়ত পৌঁছে দিতে “ভোক্তা কণ্ঠ” নামক একটি মাসিক বুলেটিন প্রতিমাসে প্রকাশ করে থাকে, যা বাংলা ভাষায় প্রকাশ করা হয়। এছাড়া, অত্র বিষয় নিয়ে ইংরেজি ভাষায় তিন মাস পরপর অর্থাৎ, ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিনও প্রকাশ করে সংগঠনটি। এটি বাংলাদেশ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভোক্তা সম্পর্কিত বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার সদর দপ্তর বরাবর ডাকযোগে পাঠনো হয়। এছাড়াও বাইরের নানা ইস্যু কিংবা ভোক্তাদের নানা সমস্যার দিক অনুসারে ছোট ছোট বই, প্রচারপত্র, ফোল্ডার ইত্যাদি নিয়মিত প্রচার করা হয়ে থাকে। মূলত, তাদের কাজ হচ্ছে জনগণকে সচেতন করা ও তাদের অধিকার সঠিকভাবে আদায়ে সাহায্য করা। ক্যাব-এর একটি অভিযোগ গ্রহণ কেন্দ্র আছে যেখানে ভোক্তাগণ তাদের সব ধরনের অভিযোগ জানিয়ে বিশেষজ্ঞের মতামত ও আইনি সহায়তা পেতে পারে এবং যাদের কারণে তাদের স্বার্থহানি ঘটেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানু ব্যবস্থা গ্রহণে সহযোগিতা পেতে পারে। প্রতিদিনের বাজার পরিস্থিতি ও ভোক্তাদের আগ্রহের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ভোক্তাদের অবহিত করার জন্য ক্যাব-এর গ্রন্থাগারসহ একটি ভোক্তাতথ্য কেন্দ্র আছে। এছাড়া ক্যাব দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে।ক্যাব-এর কার্যক্রমের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলো –

১) দেশে একসময় মিল্কভিটা কোম্পানি গরুর দুধের সঙ্গে আমদানি করা গুঁড়া দুধ মিশিয়ে তা খাঁটি গরুর দুধ নামে বিক্রয় করতো। ক্যাব কর্তৃক এই বেআইনি কর্ম উদঘাটনের পর মিল্কভিটা তা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

২) জাতীয় ঔষধনীতি প্রণীত হবার অনেক আগে থেকেই ক্যাব ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় নানা ওষুধ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার অনেক প্রচারণা চালায় এবং ঔষধনীতি প্রণীত হলে তা জনগণকে জানানোর একটি অভিযান পরিচালনা করে।

৩) ১৯৮৪ সাল থেকে ক্যাব মাতৃদুদ্ধ পানের সুফল সম্পর্কে প্রচারাভিযান চালিয়ে আসছে এবং মায়ের দুধের বিকল্প শিশুখাদ্য (বিপণন) অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর বাস্তবায়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

৪) কীটনাশক বিপণন নীতিমালা ঘোষণার ক্ষেত্রে ক্যাব-এর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ছিল। ক্যাব বাজারদর পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য কমিটি গঠন, স্ট্যান্ডার্ডস ইনস্টিটিউট পুনর্গঠন এবং স্ট্যান্ডার্ডসমূহের তালিকা প্রণয়ন ও ভোজ্য তেলে ভেজালের মাত্রা পরিমাপের জন্য কমিটি গঠনে সাহায্য করেছে।

৫) ক্যাব সরকারের পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগকে পুনর্গঠনে সাহায্য করেছে।

৬) ক্যাব-এর ধূমপানবিরোধী প্রচারাভিযানের ফলে সিগারেটের বিজ্ঞাপনে ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সতর্কবাণী প্রচারের ব্যবস্থা চালু হয়।

৭) ভোক্তাদের বিভিন্ন স্বার্থ ও বিষয় সম্পর্কে সরকারি ও বেসরকারি নানা প্রকার কমিটিতে ভোক্তাদের স্বীকৃত প্রতিনিধি হিসেবে ক্যাব-এর অংশগ্রহণ একটি নিয়মে পরিণত হয়ে গিয়েছে।

ক্যাব-এর কার্যক্রম প্রায়ই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তাদের মনোপলিতুল্য সুবিধা খর্ব করে এবং তাদের অসদুদ্দেশ্যে জোট বাঁধতে বাধা দেয় বলে এসব গোষ্ঠীর প্রতিরোধের মুখে ক্যাব-এর সাফল্য এখনও সীমিত পর্যায়েই রয়ে গেছে।

লেখকঃ ম্যাক্সিম গোর্কি সাম্য, অর্থনীতি বিভাগ (১ম বর্ষ), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 + 15 =

Back to top button