ইতিহাসের ডায়েরী

“শোন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গল্প বলি”- দ্বাদশ পর্ব

সাভারে ফিরে এসে বাসা পেতে দেরি হয়নি, কিন্তু সে বাসা সাজাতে সময় লেগেছিল। বাসা সাজানোর জিনিসপত্র আমরা এক মাস আগের বাণিজ্য মেলা থেকেই সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলাম। সে বিল্ডিংয়ে আরো এলেন কাদির ভাই, তারিক ভাই, লিটন ভাই, বিউটি দি, ডলি আপা, খায়রুন আপা। পরে আরো এলেন শহীদ ভাই, লুতফর, শামীম ভাই, সালাম ভাই আর হিসাব বিভাগের এক দাদা যিনি আমার কণ্যা শাশ্বতীর খেলার সাথী অমিতের বাবা। তিন তলার বাসার ব্যালকনি থেকে একদিকে কাঁঠাল টেকের কয়েকটা বাসা দেখা যেত, অন্যদিকে দেখা যেত ক্যাম্পাসের প্রাণকেন্দ্র হাসপাতাল ভবনের দিকে যাওয়া আঁকাবাঁকা পথের পাশে একাধিক পুকুর। ঘন গাছ গাছালির আড়ালে ছাদ থেকে ঢাকা-আরিচা হাইওয়ে দেখা যেত।

বাসা সাজাতে গিয়ে দেখা গেল রান্নাঘরের কিছু সামগ্রীর রং লাল; কাজেই গ্যাসের চুলাটিও লাল হতে হবে। সপরিবারে ছোটো নবীনগর, ছোটো সাভার। আমাদের ছিল একটা লাল রঙের রান্নাঘর।

শাশ্বতী অনেক খেলার সাথী পেল- তারিক ভাইয়ের মেয়ে তারিন, অমিত, সালাম ভাইয়ের ছেলে শশী আর লুৎফরের মেয়ে প্রজ্ঞাকে। শাহজাহান ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা (ঊর্মি আর ধ্রুব) ওর চেয়ে অনেকটাই বড় ছিল, মাঝে মধ্যে খেলত। আর নিয়মিত খেলার সাথী ছিল অনিল দা- রেখাদির ছেলে মেয়ে তমা আর তোতন। তখন বাচ্চাদের টোনাটুনির ক্যাসেট শোনার যুগ; তমা- তোতন আমাদের বাসায় এসে শুনত। হাত ভাংগার কিছুদিন পরেই ডা. আলগিন চলে গেছে পিজি হাসপাতালের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের প্রশিক্ষণার্থী হয়ে, নয়ত এতদিনে ওর ছেলে বুবকা সেরেলাক খাওয়া ছেড়ে দিত, শাশ্বতীর আরেকজন জুনিয়র খেলার সাথী হতে পারত। একদিন আড়াই বছরের শাশ্বতী পাশের বাসার শশীর সাথে খেলতে গিয়ে বোধহয় বনিবনা হয়নি; সে চারতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে প্রায় অর্ধ-কিলোমিটার দূরে হাসপাতালে ডিউটিরত বাবার খোঁজে রওনা দিয়েছিল। এদিকে ওর মা খুঁজে পাগলপারা, ভাগ্যিস পথে লিটন ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল!

স্বাস্থ্যকর্মীরা ডাক্তারদের বাচ্চাদেরকে যথেষ্ট আদর করত। একবার ভিটামিন-এ দিবসে কাদির ভাইয়ের ছেলে অর্ককে একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী ভিটামিন-এ খাওয়ানোতে বাচ্চার মাথায় চাপ পড়ে (Intracranial Pressure) বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়ে। কাদির ভাই খুব ভয় পেয়ে গেলেন। কিন্তু ইকবাল ভাই দক্ষতার সাথে বাচ্চাটিকে ম্যানেজ করে ফেলেন।

কর্মজীবি মায়েদের শিশুদের জন্য ছিল ডে-কেয়ার সেন্টার। এই ডে-কেয়ার সেন্টারের পত্তন ‘৮৪ সালে, সম্ভবত বাংলাদেশের কোনো কর্মক্ষেত্রে জিকে’ই প্রথম ডে-কেয়ারের প্রবর্তন করেছিল। সাভার জিকে ক্যাম্পাস বাচ্চাদের জন্য ছিল স্বর্গরাজ্য। ক্যাম্পাসের শিশুরা পড়ত গণ পাঠশালায় আর সাভার ক্যান্টনমেন্টের পাবলিক স্কুলে।

এখানে বিনোদনের জায়গা ছিল মাঝে মধ্যে ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধে’ বেড়াতে যাওয়া আর পর্যটনের ‘জয় রেস্টুরেন্টে’ বসা। স্মৃতিসৌধের ঘাসের উপর শাশ্বতী পাগলের মতো দৌড়াত। আমার যা আয় ছিল তাতে জয়ে বসাটা বিলাসিতাই ছিল। সে আমলে নবীনগর বাজারের পঞ্চাশ টাকা কেজির গরুর মাংসই কি চাইলেই নিয়মিত কেনা যেত! পঞ্চাশ টাকার বাজার করলে তখন ব্যাগ বোঝাই হয়ে যেত। শাশ্বতীর জন্য নবীনগর কিংবা সাভার ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে ওয়েফার বিস্কুট বা আংগুর কিনে আনতাম; এ দুটো জিনিস ছিল তার পছন্দের। শাশ্বতীর একবার গুরুতর অসুখ হয়। গলায় প্রদাহ (Pharyngitis) দিয়ে শুরু, আমার ধারণা সেটা আরো গুরুতর দিকে যাচ্ছিল। হাত দিয়ে বারবার মাথায় আঘাত করছিল আর অসুখ বিসুখে অনেক শক্ত থাকা মেয়েটা মাথাই তুলতে পারছিল না। মোফাজ্জল স্যার ওকে বাসায় এসে দেখে উচ্চ ডোজে এন্টিবায়োটিক দিলেন। বিকেলে আপেল কেটে সামনে দিতেই মেয়ে উঠে বসল। এই মোফাজ্জল স্যার আমাদের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের মেডিকেল অফিসার ছিলেন। তিনি আমার বাবার বস, কিন্তু যথেষ্ট তরুণ লাগে। আমাকে সহকর্মী হিসেবে আপনি করেই বলতেন, তুমি বলাতে পারিনি।

ক্যাডেট কলেজের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলাম। হঠাৎ একদিন সিকরুমের ডিউটি সেরে নিচে নেমে দেখি সামরিক সমন! সাভার ক্যান্টনমেন্টের মাধ্যমে বন্ধু মূর্তজা আমাকে ধরে বেঁধে ঢাকার এক চায়নিজ রেস্তোরাঁয় হাজির করার ফরমান জারি করেছে! ফোনও করেছিল – কিন্তু মোবাইল ফোনের যুগ তো সেটা নয় – যোগাযোগ হয়নি। গিয়ে দেখি আমাদের বন্ধুত্বের দেড়যুগ পূর্তি উপলক্ষে ভোজ। অনেকদিন এতগুলো বন্ধুর মুখ একসাথে দেখিনি। চিকনা চাকনা মোস্তফা এত স্থূলকায় হয়েছে যে চিনতেই পারিনি। আমি এসএসসির পর ক্যাডেট কলেজ ছেড়ে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে চলে আসি। আমি অন্যদের চোখে একটু সৃষ্টি ছাড়া ও অপ্রয়োজনীয় কাজ করে থাকি। ক্যাডেট কলেজ ছেড়ে চলে এসেছিলাম রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে! আমার পক্ষেই স্বাভাবিক নগর হাসপাতালে না এসে গ্রামীণ হাসপাতালে কাজ করা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ডাক্তারিটাই ছেড়ে দিয়ে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা।

তখন ডাক্তারি করছি পুরোদস্তুর। কিন্তু আমি ঢাকায় না গিয়ে সাভারে থেকে যাওয়াতে কাশেম ভাই আর তারিক ভাই আমাকে অতিরিক্ত কোনো একটা কাজের সাথে যুক্ত করতে চাইলেন। হয়ত প্যাথলজির দায়িত্বে থাকা শাহাদাৎ ভাইও নগরে চলে যাবেন। এমন পরিস্থিতিতে দুদিন প্যাথলজি বিভাগে গিয়ে বসে থাকলাম। একদিন নানারকম বর্ম পরে ভ্যাকসিন গবেষণাগারে ঢুকলাম, সম্ভবত জীবাণুর কালচার হত সেখানে। মাস্ক, ক্যাপ, গাউন, সু-কভার ইত্যাকার ধড়াচুড়ো পরে থাকাই কষ্টকর, তার উপর যখন স্বাভাবিক ডিউটির সময়ের পর ল্যাবরেটরিতে সময় দিয়ে শিখে নিতে বলা হল, তা আমার পছন্দ হল না। আমি আমার মেয়েকে সময় দিতে চাই। এরপর একদিন কাশেম ভাই ডেকে একটা ডায়রি উপহার দিয়ে আকস্মিকভাবেই হাসপাতালের দায়িত্ব নিতে বললেন। আমি ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গিয়ে সময় চাইলাম। ঘটনাক্রম বা সময় পুরোটা ঠিকমতো মনে নেই, তবে আমি ডিউটি রোস্টার তৈরি করার দায়িত্বটুকু নিয়েছিলাম।

মাঝে মাঝেই নতুন ডাক্তার আসেন – ইব্রাহিম, মুকিত, মনীষা, কলিম, তানভীর ভাই, শাখাওয়াত, শামীম ভাই, লুতফর, নিয়াজ, রায়হান ভাই। এদের নিয়েই আমার রোস্টার। লিটন ভাই সিনিয়র ডাক্তার হয়ে গেলেন। অর্থাৎ রোস্টারের ঊর্ধে, কল দিলে সিকরুমে বা অপারেশন থিয়েটারে আসতেন; উপকেন্দ্রে যেতেন। আমি বড় কোনো দায়িত্ব না নেয়ায় হয়তোবা সিনিয়র ডাক্তার হতে পারিনি। সংসার আর দায়িত্ব গ্রহণের উভয় সংকট থেকে কখনোই মুক্ত হতে পারিনি।

কিছুদিন পর একজন প্রবীন ডাক্তার কাজে যোগ দিলেন। তিনি নাকি এক সময় ঢাকা শহরে ক্লিনিক ব্যবসার পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন। তাঁকে শেষ বয়সে এখানে চাকরি করতে আসতে হল! আমাদের প্রাইভেট চেম্বার করার নিয়ম ছিল না। এক স্বাস্থ্যকর্মী কিছুদিন পর রিপোর্ট করল তিনি নাকি বিকেলে ধামরাইতে চেম্বার করেন। জিকে থেকে ফিরে গিয়ে তিনি আর বেশিদিন বাঁচেননি।

জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাস কাছে থাকায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে কারো কারো সম্পর্ক ছিল। শহীদ ভাই আর সুকুমার দা দুজনেরই বড়ভাই জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষক ছিলেন। সেই সূত্রে সুকুমারদার বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে। মাছের কয়েকটা পদ ছিল। আমরা ভবিষ্যতের জাহাঙ্গীরনগরের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রীকে কোলে নিয়ে সেই বিয়েতে যাই। এই সুকুমারদা দু’বার বিলেত গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে এসেছেন, ডিউটির ফাঁকে ছোট ছোট পরীক্ষার বই পড়েন। জাহাঙ্গীরনগরের সাথে আরেক সেতুবন্ধন ছিলেন ইকবাল ভাইয়ের ছোট বোন নাজমুন; তিনি তখন নৃবিজ্ঞানের কৃতী ছাত্রী।

অচিরেই কর্তৃপক্ষ আমাকে দেয়ার মতো একটা নতুন দায়িত্ব খুঁজে পেয়ে গেলেন। প্রতি বৃহস্পতিবার দৌলতদিয়া পতিতালয়ে স্যাটেলাইট ক্লিনিক চালু হলে আমাকে সেই ক্লিনিকের ডিউটি ডক্টর নির্বাচিত করা হল। প্রতি বৃহস্পতিবার ভোরবেলা একজন সিনিয়র ও কয়েকজন জুনিয়র স্বাস্থ্যকর্মী নিয়ে ল্যান্ড ক্রুজারে করে শুরু হল আমার দৌলতদিয়া অভিযাত্রা।

লেখক – ডা. মোশতাক আহমদ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কবি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করছেন।

(ধারাবাহিক চলবে …)

আরও নতুন সব খবর পেতে চোখ রাখুনঃ ইতিহাসের ডায়েরী ধর্ম ও জীবন

Zafrullah Chowdhury, Zafrullah Chowdhury, Zafrullah Chowdhury, Zafrullah Chowdhury

এই জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

8 + 14 =

Back to top button