ইতিহাসের ডায়েরী

শোন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গল্প বলি; একাদশ পর্ব: কবিতাহীন জীবন

আমি শ্রীপুরের বেশ জমজমাট দিনেই সেখানে পোস্টিং পেয়েছিলাম। তারিক ভাই যখন শ্রীপুরে এসেছিলেন, রাতে ঘুমাতে গেলে মাটির মেঝে থেকে ইঁদুরের মাটি তোলা দেখতে দেখতে সাপের ভয়ে মশারীর মধ্যে সিঁটিয়ে থাকতেন সকাল হবার অপেক্ষায়। দিনের পর দিন খেতে বসে পেতেন কচু আর মরিচ ভর্তা। কিন্তু তারিক ভাইদের প্রজন্ম জেনে-বুঝেই গণস্বাস্থ্যে এসেছিলেন।

আমি যখন এসেছি তখন মেসে প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য ভর্তুকি আছে। আমি আটাত্তর জন প্রশিক্ষণার্থী প্যারামেডিককে পেয়েছিলাম যার সাতাত্তর জনই মেয়ে। সকাল হলেই রূপা-তাসলিমারা সাইকেল নিয়ে গ্রামে গ্রামে মা ও শিশু স্বাস্থ্য, বয়স্ক স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধীদের স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান কর্মসুচি হাতে কলমে শেখার জন্য বেরিয়ে পড়ত। শিরিয়া আপা মাঠে থেকে ওদেরকে গাইড করতেন। শিরিয়া আপা মাতৃস্বাস্থ্য আর পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে ক্লাস নিতেন, আমি ক্লাস নিতাম বিভিন্ন ধরনের অসুখ, পুষ্টি, শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে।

আবার হঠাৎ করে কখনো শিরিয়া আপা ‘যোগাযোগের’ ওপর একটি গাইড ধরিয়ে দিয়ে আমাকে হয়ত বললেন যোগাযোগ বিষয়ে ক্লাসে আলোচনা করতে, এমনটাও হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষা নিয়ে পরীক্ষার খাতা দেখতে গিয়ে দেখি সুন্দর হাতের লেখার অধিকারী লিপিকার খাতা শাদা! বারবার জিজ্ঞেস করেও শাদা পৃষ্ঠার রহস্য বের করতে পারিনি। ছাত্র-ছাত্রীদের এক বছরের প্যারামেডিক কোর্সের ছয় মাসের বুনিয়াদ গড়ার কাজ ছিল শ্রীপুর টিমের। পরে এই কোর্সকে তিন বছরের পরিপূর্ণ কোর্সে রূপ দেয়া হয়। আমার আটাত্তর জন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এখন মাত্র দুজন গণস্বাস্থ্যের সাথে আছে। বাকিরা নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

নতুন ছাত্র-ছাত্রীরা কেন্দ্রে আসার পর ওদেরকে নিয়ে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। ছাত্রীরা গান গাইল। শিরিয়া আপা আর আমার স্ত্রী দুজনেই গান গাইলেন। আমার স্ত্রীর জন্য এই শ্রীপুরবাস ছিল গণ্ডগ্রামের পরিবেশ পরিস্থিতিতে মানিয়ে চলার পরীক্ষা। আমার কন্যা শাশ্বতীর বয়স তখন দেড় বছর। ওর ছোট থেকেই ঠান্ডার ধাত, তাই গ্রামীণ শীতকালে অতিরিক্ত সাবধান থাকতে হয়েছে। ওখানে শাশ্বতীর আদরের অভাব ছিল না। হিসাবরক্ষক মনিকা ওকে নিজের অফিসে বা বাসায় নিয়ে যেত, প্রতিদিনই ক্রিম বিস্কুট কিনে দিত। শাশ্বতীকে নিয়ে মেতে থাকত ছাত্রীরাও – কামরুন, মুক্তা কিংবা নূর আক্তারের কোলেও কম সময় কাটেনি তার। রহমান ভাইয়ের ছোট ছেলে শাওন ওকে পুকুর ঘাটে পাহারা দিয়ে রাখত।

মেয়ে হাঁটতে শিখেছে, তাই পুকুরটা সব সময় একটা গোপন ভয়ের জায়গা ছিল। ঈশ্বরের কৃপা, পুকুর থেকে একবার একটি দাঁতাল মাছ ধরা পড়ার পর তাকে সেটি দেখানোর পর থেকে ‘পুকুরে পোয়া মাছের দাঁত আছে’ শুনলে মেয়ে ভয় পেত! আর শাশ্বতীর মায়ের কাজ কি ছিল? সে কেরোসিনের চুলায় তিন বেলা রবার্ট ব্রুসের অধ্যবসায় নিয়ে রান্না করত আর ‘চার বেলা’ আমার জন্য চা করত। টি-ব্রেক নেয়ার জন্য বাসায় গেলে অপেক্ষমান রোগিরা ডাক্তারের বারবার চা খাওয়া নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করত (গ্রামে আমি কোনো চায়ের দোকান দেখিনি)।

লাল শার্ট পরা স্বাস্থ্যকর্মী ওবায়দুর রোগিদেরকে প্রবোধ দিয়ে বলত ‘আমাদের ডাক্তারের তিন বেলা ভাত আর চার বেলা চা লাগে!’ কেরোসিনের চুলার জন্য কেন্দ্রের গেটেই ইব্রাহীমের দোকান থেকে কাচের বোতলে করে ‘শাদা তেল’ কিনে আনতাম। সেই সাথে শাশ্বতীর স্ন্যাকস হিসেবে পাওয়া যেত ‘মুরলী’! যে সব বুধবার আমরা শ্রীপুর বাজারে যেতে পারতাম না, সে সব দিনে ইব্রাহীম আমাদেরকে বাজারও করে দিত।

কর্মীদের কাছে শুনতাম বরমীতে একটা বড় বাজার বসে। বরমীর প্রতি আরো আগ্রহ ছিল এ কারণে যে শুনেছি বাজারটা নদীর পাড়ে। কিন্তু কখনো যাওয়া হয়ে ওঠেনি কেননা আমাদের সাপ্তাহিক ছুটি ছিল বুধবার, সেদিন এ ধরণের বাজার বসত না। মাঝে মাঝে গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে মেয়েকে গাছ-পালা, হাঁস-মুরগি, গরু–ছাগল চেনাতাম। রাস্তায় দেখলে গ্রামবাসী খাতির করে বাড়ির ভিতরে নিয়ে বসাতে চাইত বলে এই বৈকালিক ভ্রমণ পরিত্যাগ করলাম। বরং মেয়েকে কেন্দ্রের ভিতরে বিভিন্ন সাইনবোর্ডের সামনে নিয়ে কি লেখা আছে তা পড়ে শুনিয়ে ফিডব্যাক নিতাম!

ছোটবেলায় আমি যখন মির্জাপুর থেকে ঢাকা বেড়াতে আসতাম, তখন নাকি হাঁটার সময় রাজধানী শহরের বিভিন্ন সাইনবোর্ড পড়তে গিয়ে আমি আমার সঙ্গীদের কাছ থেকে পিছিয়ে পড়তাম। যা হোক, আমাদের শ্রীপুরের হিমঘরে কয়েকটা রূপকথার ছবির বই ছিল, সে সব উলটে-পালটে শাশ্বতীর নিজস্ব জগত তৈরি হত। কিন্তু দ্রুতই সেসব বইতে তার কৌতূহল মিটে যায়, তাই নতুন গল্পের খোঁজে প্রতিদিনই একটি করে চলমান অশরীরী ‘বেতালে’র কাহিনী বানিয়ে বলতে হত। মেয়েকে ব্যস্ত রাখার জন্য দেয়ালে কিছু কার্টুন ছবি সেঁটে রেখেছিলাম। কার্টুন চরিত্রগুলো কিভাবে গোবেচারার মতো দেয়ালে আটকে গেল, তাই নিয়ে শাশ্বতী খুব অবাক হত।

শ্রীপুরেও আমাদের মেহমান এসেছে। জিললুর ভাইয়ের কথা আগেই বলেছি। আমাদের ভাগ্নী চম্পা এসে একবার কয়েকদিন থেকে গেল। একদিন দেখি আকস্মিকভাবে আব্বা, আম্মা আর আমার ছোট ভাই এসে হাজির। অপু ভাই আর কুমকুমের দলও একবার গবেষণার কাজে শ্রীপুরে এসেছিল।

আমার কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীর নাম শ্রীপুরের দুই পর্বে উল্লেখ করেছি। আরো কিছু নাম মনে আসছে, কিন্তু নাম অনুযায়ী চেহারাগুলো ঠিকঠাক মনে করতে পারছি কিনা তা যাচাই করে নেয়ার কোনো পদ্ধতি নাই। আরো যারা ছিল তারা হচ্ছে সাদেকা, মণি, নার্গিস, শাহীনূর, নাসরিন, চম্পা, শিল্পী, বীণা, রেজিয়া, আয়েশা, শিখা, সুমিত্রা, লুতফা, হাজেরা, নাছিমা, শারমিন, মৌসুমী আর চাম্বু গং। শিল্পীর বাবা কাছাকাছিই কোনো ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন; একবার এসে অনুরোধ করলেন মেয়ের কপালের টিউমারটি যেন অপসারন করার ব্যবস্থা করি। দেলোয়ার স্যার খুব সুন্দরভাবে শ্রীপুরের অপারেশন থিয়েটারেই সেটা অপসারন করেছিলেন। রেজিয়ার বাবাকে রহমান ভাই চিনতেন, তিনি গণস্বাস্থ্যের শুরুর দিনগুলোতে ছিলেন অতন্দ্র প্রহরী।

আমি শ্রীপুরে বসে বসে ধানমন্ডির নগর হাসপাতালে চলে যাওয়া শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের সাথে চিঠি যোগাযোগ চালিয়ে যাই আর নগর হাসপাতালের পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝতে চেষ্টা করি। কেন যেন মনে হয়েছিল নগরবাস আমার জন্য শান্তিপূর্ণ হবে না। আমি শান্তিপ্রিয় বলেই হয়তোবা অপ্রিয় ঘটনার সাক্ষীও হতে হয় কম। আমার বছর দেড়েক পরে ডা. মুকিত শ্রীপুরে গিয়েছিল। শ্রীপুর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জমিদাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আলহাজ্ব ছফির উদ্দিন আহম্মদ, এমসিএ সাহেবের ততদিনে গণস্বাস্থ্যের রেফারেল হাসপাতাল নির্মানে দেরি দেখে আর ধৈর্য নাই; মাঝে মাঝেই ক্লিনিকে তালা ঝুলানোর ভয় দেখান। মুকিতের উৎকন্ঠার অবসান ঘটিয়ে জাফর ভাই একদিন এসে বলে গেলেন পরের মাসেই হাসপাতালের কাজ শুরু হবে। ততদিনে সাভারে নতুন কোয়ার্টার তৈরি হয়ে যাচ্ছে আর শাশ্বতীর স্কুলের চিন্তা নাই বলে আমি শ্রীপুর থেকে ফিরে গিয়ে সাভারেই সপরিবারে থাকব বলে তারিক ভাইকে চিঠিও লিখে রাখলাম।

চার মাস পর সাভারে ফিরেই কাশেম ভাই বরাবর দরখাস্ত করেছিলাম সপরিবারে আবাসিকের জন্য। পুরনো কিছু একতলা বাসা ছিল, কিন্তু আমার মনের ইচ্ছা ছিল ‘১৮ তলা’র বাসা! কাশেম ভাই দরখাস্তের উপরে লিখে দিলেন ‘১৮ ফ্ল্যাটে যাবেন’! আসলে সাভার ক্যাম্পাসে ১৮ তলা কোনো ভবন ছিল না, নতুন নির্মিত একটি ভবনে মোট ১৮ টি ফ্ল্যাট ছিল বলে লোকমুখে সেটা ১৮ তলা নামে পরিচিত ছিল।

আমার নতুন বাসাটি যদ্দুর মনে পরে ছয়শত স্কয়ার ফিটের ছোট্ট ও সুচিন্তিত ডিজাইনের একটি বাসা ছিল। ভবনটি উঁচু–নিচু টিলার উপরে ছিল বলে নিচ তলায় শুধু একটিমাত্র বাসা ছিল, যেখানে ‘নির্মান’ বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার অনিল ভৌমিক দাদা আর গণ পাঠশালার রেখাদি তাঁদের পুত্র কন্যা তমা আর তোতনকে নিয়ে থাকতেন। সে কারণে ভবনটির পরিচয় চার তলা বা পাঁচ তলা কোনোটিই না হয়ে মোট ফ্ল্যাটের সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত হয়েছিল।

পাঠক, লেখার শুরুতে যে কবিতাংশ আছে তা আমার ‘কবিতাহীন জীবনের’ লেখা। কবিতাহীন সেই জীবনে আরও লিখেছিলাম-‘যাবতীয় রটনামাধ্যম থেকে দূরে, কবিতা ও ভনিতার দুনিয়া থেকে দূরে, সাহিত্যের অনুকূল বা প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে দূরে থাকাকে যদি কেউ মরুচারিতা বলতে চায়, আমার এই নিভৃত পদচারণা হয়তোবা তাই; মনে হয় এক খাঁ খাঁ বিশুদ্ধতার দিনযাপন করছি। দেখিনি মরুদ্যান: তবে কী আবাস গড়েছি কোনো মরুদ্যানে?’

মনে মনে অনেক কথা লতিয়ে ওঠে, অনেক ব্যক্তিগত যুক্তিমালা, গভীর গোপন। কিছু শব্দ লিখিত হয়ে উঠতে চায়; বড় বেশি স্বার্থপর করে তুলেছে আমাকে বিগত দিনের কবিকর্ম। সাহিত্যমূল্য থাকবে না এমন ব্যক্তিগত দীর্ঘশ্বাসের পান্ডুলিপির কারিগর হতে অনীহা তাই। …তাই আর লেখা হয় না। ব্যক্তিগত ব্যর্থতার দায়ভার গছিয়ে দিলাম বেচারা কবিতার কাঁধে; বড় সহিষ্ণু তার কাঁধ। হয়তোবা বড়ো অভিমানে কবিতা বেচারি বিনা নোটিশে কবে যে আমার বাড়ি ছেড়ে মেঘের রাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছে, আমার উপেক্ষাভরা চোখ সে দিনক্ষণ মনে রাখা দূরে থাক, সে খবরই রাখেনি। খাঁ খাঁ বিশুদ্ধতায় ডুবে থাকি। হতে পারে তা মরুভূমি; হতে পারে মরুদ্যান। এখন আর এসব নিয়ে বিশেষ ভাবি না।

চূড়ান্ত হতাশা ও তার সম্ভাব্য পরিণতি থেকে কোনো এক ভোরবেলা ফিরে এসেছিলাম। এই ফিরে আসার বিষয়েও আছে দীর্ঘ যুক্তি-ভাণ্ডার! আমার প্রতিটি ভুল, প্রতিটি অন্যায়, প্রতিটি ব্যর্থতার পিছনেও একটি করে ব্যক্তিগত যুক্তি আছে। নিজের কাছে বিশুদ্ধ থাকি।

‘খাঁ খাঁ বিশুদ্ধতার জলে স্নান করি।
খাঁ খাঁ বিশুদ্ধতার রোদে পথ হাঁটি।
খাঁ খাঁ বিশুদ্ধতার আকাশ পুষে রাখি বুকের ভেতর; মগজের অন্ধকার আলোকিত করে রাখে এক ধরণের খাঁ খাঁ বিশুদ্ধতার লাবণ্য।‘

লেখক – ডা. মোশতাক আহমদ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কবি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করছেন।

(ধারাবাহিক চলবে)

আরও খবর পেতে চোখ রাখুনঃ ইতিহাসের ডায়েরী ধর্ম ও জীবন

History Gonoshasthaya Kendra, History Gonoshasthaya Kendra, History Gonoshasthaya Kendra, History Gonoshasthaya Kendra

এই জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 − eight =

Back to top button