ইতিহাসের ডায়েরী

“শোন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গল্প বলি”-দশম পর্ব

শ্রীপুর কেন্দ্রে পৌঁছেই আমি ছেলেদের হোস্টেলের পূর্বদিকের ঘরটি পেলাম। যদিও দিন পনেরোর মধ্যেই আমার স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে এলে আমি ফ্যামিলি কোয়ার্টারে উঠে যাব, তবু অনেক দিন লেখালিখি কিছুই হয়নি চিন্তা করে টেবিলটা সাজিয়ে নিলাম। অবশ্য লেখালিখির ধারায় ফিরে আসতে আমার আরো অর্ধ-যুগ লেগে যাবে, আর কবিতা আবার ফিরে আসবে আরো প্রায় এক যুগ পরে- সে কথা তখন জানতাম না। জানলে লেখার চিন্তা না করে বরং আরও পড়তে পারলে কাজে লাগত। সে ভিন্ন গল্প।

ছেলেদের হোস্টেল, যথারীতি স্কুলঘরের মতো দেখতে; সেটার অন্যান্য ঘরে থাকত স্বাস্থ্যকর্মী বারেক, ওবায়দুর, কামাল আর নতুন ছাত্র মোঃ জোনাব আলী। কম্পাউন্ডের সামনের বাড়িটি ক্লিনিক- আউটডোর, ইনডোর, ছোট অপারেশন থিয়েটার, অল্প কিছু প্যাথলজি পরীক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘কদরজান ক্লিনিক’ (১৯৮১ সালে স্থাপিত)। গ্রামের মানুষের অনেক ভরসার জায়গা, বিশেষ করে স্বাভাবিক ডেলিভারির জন্য মায়েরা এই কেন্দ্রটিকে বেছে নিয়েছিলেন। ‘ক্লিনিক ডে’ ছিল সপ্তাহে দু’দিন, রোগি সামলাতে হিমশিম খেতে হত। ক্লিনিকের সামনে রাস্তার ওপারে জমিদাতা সাবেক এমসিএ বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ ছফির উদ্দিন আহাম্মেদ সাহেব নিজের জন্য নতুন করে বাড়ি করেছেন। কেননা মূল বাড়ি আর পুকুরসহ জমিটুকু তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে দান করেছেন। তাঁকে আমি দেখেছি; তখন বার্ধক্য, মনে আশা নিয়ে আছেন কদরজান ক্লিনিকটি কবে একটা বড় হাসপাতালের রূপ নিবে।

আমি দেখে আসতে না পারলেও, তিনি তা দেখে গিয়েছিলেন। ক্লিনিকের পিছনে উঠোন; তার একদিকে পুকুর, অন্যদিকে একটা ডোবায় গাছ থেকে অজস্র ধারায় বরই পড়ে ভেসে উঠছে। উঠোনের পিছনেই ফ্যামিলি কোয়ার্টার। এক পাশে ম্যানেজার রহমান ভাই আর প্রশিক্ষক শিরিয়া আপার সংসার, অন্য পাশে ইনচার্জ সিরাজ আর স্বাস্থ্যকর্মী সুফিয়ার সংসার; মাঝখানে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার এক রুম বিশিষ্ট খালি বাসা। রহমান ভাইয়ের বাসা বাম দিকে আর পুকুরটা ডান দিকে রেখে যেতে হয় লাল ইঁটে গড়া প্রশিক্ষণার্থীদের আবাসিক ভবন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, লাইব্রেরি আর ডাইনিং হলে। এই লাল ইটগুলো ধামরাই বা মানিকগঞ্জের ‘গণ ইট প্রকল্প’ থেকে আনা হয়েছিল কিনা জানি না। ডাইনিং -এ জ্যোৎস্না নামের হাশিখুশি চেহারার এক রাঁধুনি বহু মানুষের রান্না নিয়ে বেশ ব্যস্ত থাকতেন, মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পরে এক বুড়োসুরো মানুষ জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে নিয়ে আসতেন। কিছুক্ষণ জিরিয়ে চলে যেতেন। বলে রাখি, রাঁধুনি জ্যোৎস্নার দয়া না হলে কিন্তু আশেপাশের চার কিলোমিটারেও এক কাপ চা মিলবে না!

প্রকল্পের ম্যানেজার আব্দুর রহমান ভাইয়ের কিছুটা চোখ ঘুরিয়ে কথা বলা দেখেই বুঝা যায় ইনি জাফর ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ শিষ্য। অবশ্য তার চুল জাফর ভাইয়ের অনুকরণে কোনো কোনো সিনিয়র কর্মীদের মতো চুলে বাবড়ি বিন্যস্ত না হলেও কিছুটা অবিন্যস্ত ছিল। তিনি ফ্রান্স থেকে ফিজিওথেরাপিতে পড়াশুনা করে এসেছেন। ফ্রান্সে জাঁনেসার ওসমানের সাথে ঘনিষ্টতা হয়েছিল, সেই কথা বলতেন। শিরিয়া ভাবী প্রশিক্ষণ, মাঝে মধ্যে ডেলিভারি রুমে তদারকি আর মাঝে মধ্যে ভেসপা নিয়ে গ্রাম পরিদর্শণ নিয়ে ব্যস্ত জীবন কাটাতেন। তিনি একজন ধৈর্যশীল প্রশিক্ষক ছিলেন। কোনো শিক্ষার্থী প্যারামেডিক অসুস্থতার দোহাই দিয়ে সকালে সাইকেলে করে গ্রামে যেতে না চাইলে, তিনি দ্রুত তাকে সিকরুমে ভর্তি করে কেন্দ্রে অবস্থানরত কাউকে মনিটর করতে দিয়ে প্রশিক্ষণার্থীদেরকে নিয়ে ফিল্ডে চলে যেতেন। শিক্ষার্থীদের আবাসিক কক্ষগুলো যথেষ্ট উষ্ণ ছিল, সে তুলনায় সিকরুম ছিল হিম শীতল! অবাধ্য শিক্ষার্থীর জন্য মোক্ষম জায়গা! সিকরুমে প্রসূতি ছাড়াও কিছু শিশু মাঝে মধ্যে ডায়রিয়া বা নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি হত। শহরের চাইতে গ্রামে দ্রুতই শীত চলে আসে, শ্রীপুরে শীতকাল ছিল এক স্মরণীয় শীতকাল; রাতে মনে হত টিনের চাল থেকে লেপের উপর বরফ পড়ছে! শীতের প্রকোপ ভুলে যেতাম, যখন রহমান ভাইয়ের ছেলে সোহেল আর শাওন কেন্দ্রের খেজুর গাছগুলো থেকে এলুমিনিয়ামের কলসি কিংবা জগে ভরে রস চুরি করে আমার রুমে নিয়ে আসত!

শ্রীপুরে আমি মাঠে গেছি কম। ক্লিনিক সামলানো, প্রশিক্ষণার্থী স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্লাস নেয়া, আর মাঝে মধ্যে দূরের কোনো গ্রামে জটিল যক্ষা রোগি ফলো-আপ করাই ছিল আমার মূল কাজ। আউটডোরে এত রোগি দেখতে দেখতে আমি অনেক জটিল শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে শিখলাম। এখানে তো হার্ট ফেইলিওর আর হাঁপানিজনিত শ্বাসকষ্টের মধ্যে পার্থক্য না করতে পারলে ‘আনোয়ার স্যার দেখবেন’ বা ‘ইকবাল ভাই দেখবেন’ লিখে রেফার করার উপায় নাই। সপ্তাহে একদিন যেতাম শ্রীপুরের ‘শিশুপল্লী প্লাস’– অষ্টম ও নবম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাস্থ্যশিক্ষার ক্লাস নিতে। ওই বয়সী বাচ্চাদের ক্লাস কন্ট্রোল করার যে কি হ্যাপা ছিল! পথের দু’পাশে শাল গজারীর বনের মাঝ দিয়ে লাল রঙের সিডি-৮০ মোটর সাইকেল নিয়ে আসা যাওয়াটা খুব উপভোগ্য ছিল। শিশুপল্লী জিকের কোনো উদ্যোগ নয়, জিকের সাথে তাদের চুক্তি ছিল।

আমার ঠিক মনে নেই আমার নতুন প্যারামেডিক ছাত্র-ছাত্রীরা আগে এসেছিল নাকি আমার পরিবার আগে এসেছিল। আমাদের কাছে শ্রীপুর কেন্দ্রটিকে একটি বর্ধিত পরিবার বলেই মনে হয়েছে। আমার স্ত্রীর সাথে কেন্দ্রের সকল কর্মী ও প্রশিক্ষণার্থীদের সুন্দর সম্পর্ক ছিল। শ্রীপুর কেন্দ্রে থাকাকালীন বুধবার দিন শ্রীপুর গিয়ে বাজার সদাই করতে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট হোটেলে দুপুরের আহার করা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিনোদন ছিল না। এ ছাড়া দেলোয়ার স্যারের গাড়িতে কোনো কোনো সোমবার ঢাকা চলে যাওয়াটাও ছিল একটা আনন্দময় ঘটনা। গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ রেফার করা রোগি দেখার জন্য প্রতি মাসের দ্বিতীয় ও চতুর্থ সোমবার সকালে চলে আসতেন। রোগি দেখা, দু’একটা ছোটখাটো অপারেশন করা নিয়ে তিনি হাসিমুখে ব্যস্ত সময় কাটাতেন।

একবার দেলোয়ার স্যারের সাথে ফরাসী ডাক্তার ভিনসেন্ট (Vincent Ioos) এসেছিল প্রকল্প দেখার জন্য। আমার বাসায় বসে কিছুক্ষণ গল্প করার ফাঁকে সে জানিয়েছিল প্যারিস সম্পর্কে তাঁর বিশেষ ধারণা নাই, তাঁর বাড়ি ফ্রান্সের উত্তর দিকের গ্রামাঞ্চলে। শীতের অপরাহ্ণে কত যত্ন করে গরম কফির পেয়ালাটা দু’হাতে ধরে রেখেছিল, তা আজও মনে পড়ে। ভিনসেন্ট চুপচাপ স্বভাবের তরুণ ছিল। তাই হয়ত আমার সাথে খাতির। গিয়েছিল। পরে জিকের বাসাতেও ভিনসেন্টকে আমার বাসায় একদিন দুপুরে খেতে ডেকেছিলাম। আমার একজন ছাত্রী ছিল খৃস্টান, এলিজাবেথ মালো, খুবই চটপটে; শ্রীপুরে থাকাকালীন সময়ের বড় দিনে ওকে আমার বাসায় দাওয়াত করেছিলাম। খাবার আগে সে বিশাল এক প্রার্থনায় বসে গেল; এটা আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা ছিল।

শ্রীপুরে আমরা বিজয় দিবস উদযাপন করেছিলাম। সেদিন মূল কেন্দ্র থেকে অতিথি হিসেবে ইকবাল ভাই এসেছিলেন। নতুন প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশ্যে তাঁর বক্তব্যে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শ্রদ্ধেয় বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা রশিদ ভাইয়ের বলা মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী বলেছিলেন; রশীদ ভাই ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় গেরিলা বাহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করছেন।

ইকবাল ভাইয়ের বয়ানেই শোনা যাক- “আজ ১৯৯৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের আজ ২৫ বছর। ২৫ বছর আগে ১৯৭১ সালে আমরা পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে ৯ মাসের সর্বাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের শাণিত চেতনার কেতন উড়িয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদেরকে আত্মসমর্পনে বাধ্য করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলাম। … ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাস। রোজার ঈদের সকালবেলা। গোসল করতে ৮ জনের একটি গেরিলা দল নিয়ে গ্রামের এক বাড়ির পুকুর ঘাটে এলো। ঈদের আগের সারারাত পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার বাহিনীর ক্যাম্পে গেরিলা কায়দায় গুলি ও গ্রেনেড হামলা করে ওদেরকে বাঙ্কারে ঢুকিয়ে রেখেছেন। ভয়ে ওরা আজ আর ঈদের নামাজ পড়তে বের হবে না। ১৯৭১ সালে গায়ে মাখার এতো সাবানের বাহার ছিল না। রমনা গোল্লা সাবান অথবা আলমের পঁচা সাবান দিয়ে কাপড় ধোয়া ও গোসল দুই-ই চলত। সেই রমনা সাবানের এক টুকরো দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ভাগাভাগি করে গোসল করছে। একই ঘাটে এক গরীব কৃষক ও তার ৬ বছর বয়সের মেয়ে গোসল করছে। তখন ঈদের আগের গ্রামের বাজারে আট আনা দামের রঙিন সুগন্ধি সাবান পাওয়া যেত। তিব্বত, লাক্স, রেক্সোনা সাবান ধনীরা কিনতে পারতো। বাবা মেয়ের হাত থেকে সুগন্ধি সাবান নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা রশিদ ভাইয়ের হাতে দিলেন। বললেন, “ভাইয়েরা, আপনারা আমার মেয়ের এই সুগন্ধি সাবান দিয়ে গোসল করেন।” রশিদ ভাই বললেন, “না না, এটা দিয়ে আপনার মেয়ে গোসল করবে। সারা বছর শখ করে রয়েছে ঈদের সকালবেলা সুগন্ধি সাবান দিয়ে গোসল করবে।” কৃষক বাবা বললেন, “আপনারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করছেন। দেশ স্বাধীন হলে আমাদের মতো গরীবরা সারা বছর ধনীদের মতো লাক্স সাবান দিয়ে গোসল করবে। আমার মেয়ের আর ঈদের সুগন্ধি সাবানের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। আপনারা গোসল করে আমার বাসায় আসেন।”

গোসল করে রশিদ ভাইয়ের গ্রুপ কৃষকের বাড়িতে গেলেন। কৃষাণী সেমাই রান্না করেছেন। বাচ্চাদের জন্য দুধ সেমাই। অন্যদের জন্য দুধ ছাড়া চিনি দিয়ে সেমাই। কৃষাণী দুধ সেমাই ৮ জন মুক্তিযোদ্ধাদের ভাগ করে দিলেন। বাচ্চাদের দিলেন দুধছাড়া সেমাই। রশিদ ভাইরা না না করে উঠলেন। রশিদ ভাই বললেন, “মা, বাচ্চাদের দুধ সেমাই দেন। আমরা দুধ ছাড়া সেমাই খাব। কৃষাণী বললেন, “আপনারা দুধ সেমাই খান। দেশ স্বাধীন হলে আমার ছেলেমেয়েদের দুধ সেমাইয়ের অভাব হবে না।”

রশিদ ভাই বললেন, মঙ্গল কাব্য ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর অন্নদামঙ্গল কাব্যে ঈশ্বর পাটুনীর মুখ দিয়ে যা বলিয়েছেন তাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা – “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।”

লেখক – ডা. মোশতাক আহমদ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কবি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করছেন।

(ধারাবাহিক…)

আরও পরুনঃ ইতিহাসের ডায়েরীভাইরাল নিউজ

Gonoshasthaya Kendro, Gonoshasthaya Kendro,Gonoshasthaya Kendro, Gonoshasthaya Kendro,Gonoshasthaya Kendro,

এই জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen − 12 =

Back to top button
Close