ইতিহাসের ডায়েরী

‘শোন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গল্প বলি’; অষ্টম পর্ব: কেন্দ্র থেকে পরিধি

ক)
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশি চিকিৎসকগণ চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. এ এইচ সায়েদুর রহমানকে সভাপতি এবং ভাস্কুলার সার্জারির তরুণ পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের ছাত্র ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন-ইউকে (BMA-UK) গঠন করে। ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম দিকে বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন-ইউকে, ডা. এম এ মবিন ও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করার জন্য ভারতে পাঠায়। তারা অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) অনুমোদনে সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের সহযোগিতায় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আগরতলার বিশ্রামগঞ্জে ৪০০ শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ হাসপাতাল’ স্থাপনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দুই নম্বর সেক্টরের অধীনে ইতোমধ্যেই সীমিতভাবে সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের ক্যাপ্টেন ডা. আখতার আহমেদ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছিলেন ও একটি হাসপাতাল গড়ার চেষ্টা করছিলেন। বিলেতের দলটি এই স্বপ্নকে বৃহৎ পরিসরে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. এম এ মবিন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য দুই নম্বর সেক্টরে একটি সংগঠিত ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের চিন্তাভাবনা করেন এবং বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন-ইউকে ও ইউরোপ প্রবাসীদের সহায়তায় বড় হাসপাতালের স্বপ্ন দেখেন।

আগরতলার বিশ্রামগঞ্জে হাবুল ব্যানার্জি নামের একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনহিতৈষী ব্যক্তির একটি লিচু বাগান ছিল; এই লিচু বাগানেই তিনি হাসপাতালটি স্থাপনের জন্য অনুমোদন দেন। উল্লেখ্য যে, হাবুল ব্যানার্জি কুমিল্লার লোক ছিলেন এবং নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করেছেন বলে জানা যায়; তাই তিনি সহজেই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

মেজর খালেদ মোশাররফের মাধ্যমে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের বরাদ্দকৃত ৩০,০০০ ভারতীয় রুপি হাতে নিয়ে বাঁশ-কাঠে গড়া হাসপাতালের কাজ শুরু হয়। তাঁরা যুদ্ধাহত, শরণার্থী ও স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যসেবা দিতে শুরু করেন। শুরুতে ২৫ শয্যার হাসপাতালটি ডিসেম্বর নাগাদ ৪০০ শয্যায় উন্নীত হয়। আগস্ট মাসে সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের ডাক্তার ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম এই হাসপাতালের কমান্ডিং অফিসার নিযুক্ত হন। ক্যাপ্টেন সিতারা ছিলেন গেরিলা কমান্ডার মেজর এটিএম হায়দারের ছোট বোন। অক্টোবর মাসে খালেদ মোশাররফ আহত হবার পর মেজর হায়দার ২২ অক্টোবর দুই নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব বুঝে নেন।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী অধিকৃত বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা পূর্ব অভিজ্ঞতাহীন স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ নারীদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী বাহিনী গঠন করেন; তারা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারত আর অপারেশন থিয়েটারেও কাজ করত। জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, “এই মেয়েরা অতি দ্রুত রোগির সেবা করা, জখমের চিকিৎসা দেয়া আর শিরায় স্যালাইন দেয়া শিখে নিয়েছিল।“

শুরু থেকে থাকা ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ এর সাথে পরবর্তীতে হাসপাতালে যোগদান করেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন, ডালিয়া সালাহউদ্দীন, কিরণ শংকর দেবনাথ, এ.কিউ.এম মাহমুদ (ফারুক), লুতফর রহমান, মোরশেদ চৌধুরী, মোহাম্মদ জুবায়ের, এম এ কাশেম (তাঁরা সকলেই তখন মেডিকেল এর ছাত্র)। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের ইন্টার্ন ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ মে মাসের প্রথম সপ্তাহেই কিছু সার্জারির যন্ত্রপাতি আর মেডিকেল সাপ্লাই নিয়ে দুই নম্বর সেক্টরের সদরদপ্তরে চলে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ত্রিপুরা সরকারের মাধ্যমে ডা. বোস নামে একজন ভারতীয় সার্জনও পরবর্তীতে যোগ দেন। আগরতলার জিবি পান্ট হাসপাতালসহ (G.B. Pant Hospital — Govind Ballabh Pant Hospital, Agartala) ত্রিপুরা রাজ্যের আরো কয়েকটি হাসপাতালে জটিল রোগি রেফার করা হত। জিবি পান্ট হাসপাতালের সার্জন, রেডক্রসের সাথে জড়িত ডা. রথীন দত্ত খুবই সহযোগিতামূলক আচরণ করেন। এই হাসপাতালের মূল দায়িত্ব পালন করেছেন এবং অধিকাংশ অপারেশন করেছেন ডা. এম এ মবিন (বর্তমানে লন্ডনে বাস করছেন)। উল্লেখ্য যে, জিবি হাসপাতালে ডা. নাজিমকে একমাসের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। ডা. নাজিমই সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র এনেসথেটিস্ট।

“বাংলাদেশ হাসপাতাল” অসংখ্য যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীর জীবন বাঁচিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই জাফরুল্লাহ চৌধুরীর প্রতীতি হয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেবলমাত্র ডাক্তার নির্ভর হবার প্রয়োজন নাই- প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও প্রতিজ্ঞা থাকলে প্যারামেডিকরাও সুন্দরভাবে একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তবে জটিল অপারেশনের জন্য বিশ্রামগঞ্জের মেলাঘর থেকে জিবি হাসপাতালের রথীন দত্তের টিমসহ আগরতলার বিভিন্ন হাসপাতালে রেফারও করতে হয়েছে।

কবি সুফিয়া কামালের কন্যা সাঈদা কামাল তখন আর্ট কলেজের ছাত্রী ছিলেন; তিনি বলেছেন, “তাঁবুতে বাস করে ন্যূনতম অন্ন-বস্ত্রের সংস্থানের মধ্যে মানুষের সেবা করার কয়েকটি মাসই ছিল আমার জীবনের সেরা সময়।“

ফলস্বরূপ ১৯৭৩ সালে জিকে নারী প্যারামেডিকদের প্রশিক্ষণ শুরু করে। ১৯৭৪ সালে নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা ‘বৈপ্লবিকভাবে’ সাইকেল চালিয়ে গ্রামের নারী এবং শিশুদের খোঁজ নিতে যেত। আমি আমার সময়েও সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে বিশ্রামগঞ্জে তৈরী হওয়া স্বাস্থ্য যোদ্ধা দেখেছি।

বাংলাদেশ হাসপাতালের নাম কথ্যভাবে ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হসপিটাল’, ‘বাংলাদেশ ফোর্সেস হসপিটাল’ এবং ‘বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতাল’ নামেও পরিচিতি লাভ করে। কেউ কেউ একে ‘বাঁশের হাসপাতাল’ও বলত।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বিশ্রামগঞ্জ, আগরতলা থেকে ‘বাংলাদেশ হাসপাতাল’ ঢাকার ১৩২ নিউ ইস্কাটন রোডে স্থানান্তরিত হয়। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে ‘পল্লী অঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা’ শীর্ষক এক বক্তব্যে স্বাস্থ্য সেবাদানের এক নতুন রূপরেখার কথা আলোচনা করেন। তখনো বিশ্বব্যাপী প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার ধারণাটি আলোচিত হয়নি; বিষয়টি কাজাকিস্তানের রাজধানী আলমা আতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্ব সম্মেলনের মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে (৬-১২ সেপ্টেম্বর) প্রথম বড় আকারে আলোচিত হয়। আলমা আতা সম্মেলনে ১৩৪ টি দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের দিক-নির্দেশনায় প্রথমবারের মতো বিশ্ববাসীর প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার (Primary Health Care) অধিকার বিষয়ে ঘোষণা দেন যাতে মানুষ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত জীবনযাপন করতে পারে এবং ‘২০০০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্য’ এই প্রতিপাদ্যটি ঘোষণা করা হয়। এই সম্মেলনে “গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র মডেল” তিনটি “Background Papers” এর মধ্যে একটি হিসাবে আলোচিত হয়।

আলমা আতা ঘোষণায় বলা হয়, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা একটি দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে নির্দিষ্ট সামাজিকগোষ্ঠির মৌলিক স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধানে, বিশেষ করে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় সরকারের বিভিন্ন খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে ভূমিকা রাখে। আরো বলা হয়, এই ব্যবস্থা স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে ব্যক্তি ও সামাজিক অংশগ্রহণের উপর জোর দেয় এবং মৌলিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জনসমষ্টির স্বাস্থ্যজ্ঞান, স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী, প্রথাগত চিকিৎসক ও দেশিয় চিকিৎসাজ্ঞানের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। আলমা আতা ঘোষণায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিশ্বের সকল জাতি ও দেশকে তাদের নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যশিক্ষার অভিজ্ঞতার আলোকে জনগণের সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কল্যাণের জন্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আহ্বান জানানো হয়।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বন্ধু অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমানের মা মিসেস লুতফর রহমানের কাছ থেকে প্রথমে ৯ বিঘা জমি এবং পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর কাছ থেকে সরকারীভাবে ২৯.৭৫ একর জমি পেয়ে সাভারের মির্জানগরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে নলাম গ্রামের দক্ষিণ অংশে নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু করতে চাইলে বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ অনুযায়ী ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ নাম নিয়ে শুরু করেন। জাতির জনক একথাও বলে দেন যে, গণস্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসাই করবে না, স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিক্ষাক্ষেত্রেও যেন কাজ করে। এই বৈপ্লবিক ভাবনা মাথায় রেখে ’৭২ এর ২৭ এপ্রিল ২২ জন স্বাস্থ্যকর্মী আর কয়েকজন ডাক্তারের সমন্বয়ে ঢাকার অদূরে জাতীয় স্মৃতিসৌধের কাছে নলাম গ্রামের দক্ষিণ দিকে ৬টি বড় তাঁবু আর গাছতলায় আউটডোর স্থাপন করে এই হাসপাতালের নতুন যাত্রা শুরু। তখন সাভার এলাকা একটা গণ্ডগ্রাম ছিল। না ছিল কোনো শিল্প কারখানা, না ছিল হাসপাতাল, না ছিল কোনো এনজিও। গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুরূপে গড়ে তোলার জন্য ‘গ্রামে চল, গ্রাম গড়’ – এই স্লোগান ও উদ্দেশ্য নিয়ে হাসপাতালটি সাভারে স্থানান্তরিত হয় এবং নামকরণ করা হয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র (জিকে)। জিকের ভিশন ছিল মূলত দুটি- দারিদ্র দূরীকরণ (‘দরিদ্রদের ভাগ্যই দেশের ভাগ্যেরও নিয়ন্তক’) এবং নারী উন্নয়ন (‘নারীর উন্নয়নই দেশের উন্নয়ন’)। উদাহরণ সৃষ্টির জন্য জিকের কর্মীরা কমিউনিটিতে যৌথভাবে বসবাস এবং সকলে মিলে কৃষিকাজে অংশগ্রহণ করার কর্মসূচি গ্রহণ করে। জাফর ভাই, কাশেম ভাই, ফিজুদারা তাঁবুতেই থাকতেন। গ্রামবাসী গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে জমি এবং দালান তৈরির নানা উপকরণ (বাঁশ, কাঠ) দান করে।

খ)
উপকেন্দ্র এবং ঢাকার বাইরের কেন্দ্রগুলোও জন-সম্পৃক্তির মাধ্যমে স্থানীয় জমিদাতাদের কাছ থেকে জমি পেয়ে গড়ে তোলা হয়। কোনো কোনো জমিদাতা হয়ত মোটিভেশনে প্রভাবিত হয়ে কিংবা পরে বড় কিছুর প্রত্যাশায় জমি দান করে থাকতে পারেন।

উপকেন্দ্রগুলোর কমিটির প্রাণকেন্দ্রে ছিল স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি। বাংলাপিডিয়া বলছে, ‘ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত মহিলা সদস্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের স্বাস্থ্য কমিটির চেয়ারপারসন নিযুক্ত হন এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের স্থানীয় ব্যাংক হিসেবের চুক্তিপত্রের স্বাক্ষরদাতা হিসেবে কাজ করেন’, বাজেট সভাতেও তাদেরই প্রাধান্য। ফলে সাইনবোর্ডে জমিদাতার নাম উল্লেখ থাকলেও, জমিদাতার সাথে আবার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

একদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আর অন্যদিকে ব্রাকের প্রশিক্ষক কামরুল আনাম ভাই কথিত ‘খাগান বিশ্ববিদ্যালয়’ (ব্রাকের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, পরবর্তীতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস) থাকা স্বত্বেও হয়তবা মিরেরচানগাঁও এর জমিদাতা ঝড়ু মণ্ডলের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি। তার বিশাল জমি আর কাঁঠালবাগানের একাংশে গণস্বাস্থ্যের জন্য জমি দান করেও তিনি ছিলেন একজন অসন্তুষ্ট ল্যান্ড লর্ড। ‘ক্লিনিক ডে’তে একদিন দেখেছিলাম শকুনের মতো এসে বসে আছেন; বলছেন, ‘এই কিলিনিকের চাইর জন মাইয়া ডাক্তাররে আমি পালি!’ অর্থাৎ তিনি বলতে চাচ্ছিলেন তিনি জিকে মিরেরচানগাঁও কেন্দ্রের চারজন নারী প্যারামেডিকের ভরনপোষণ করেন! চার নারী প্যারামেডিক ছাড়াও সেই কেন্দ্রে আবুল ভাই ইনচার্জ ছিলেন এবং কামাল নামের একজন পুরুষ প্যরামেডিক ছিলেন। ঝড়ু মণ্ডল মাঝে মাঝে কেন্দ্রের কর্মীদের উপর নানা অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করে যেত। আমি একদিন ক্লিনিক শেষে মিরেরচানগাঁও মেসের বিখ্যাত মাসকালাইয়ের ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে মোটর সাইকেল নিয়ে কাঁঠাল বাগান পার হয়ে, হাইওয়ে ধরে অক্ষত অবস্থায় জিকেতে ফিরে এসেছি (অক্ষত বলার কারণ আছে। একবার ওই কেন্দ্রে যাবার সময় জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনের রাস্তায় সদ্য ফেলা পিচের উপর চাকা পিছলে গিয়ে আমি ঐ পথে কোনো কোনো সকালে দেখা উলটে যাওয়া মালবাহী ট্রাকের মতো কিংবা নিহত তেলাপোকার মতো ঊর্ধমুখে হাত পা ছড়িয়ে পড়ে ছিলাম!) – তার কিছুক্ষণ বাদেই ঝড়ু মণ্ডলের লোকের হাতে অপদস্ত হয়ে প্রাণ ভয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে কেন্দ্রে ফিরে এসেছিল কামাল – চিকিৎসা ও আশ্রয় এই দুটি মৌলিক চাহিদার সন্ধানে!

শিমুলিয়া কেন্দ্রের ‘ক্লিনিক ডে’তে যেতে হত নয়ারহাট ব্রিজের গোড়া থেকে শ্যালো নৌকায় বংশী নদী ধরে। নৌভ্রমণ আনন্দময় কিন্তু দীর্ঘ যাত্রায় ইঞ্জিনের শব্দে কাব্য উড়ে যেত। শিমুলিয়ার ইনচার্জ ফজলু ভাই এপ্রনের সবগুলো বোতাম লাগিয়ে মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপকের বেশে ঘোরাঘুরি করতে করতে এসে আমাকে রিসিভ করে চেম্বারের ‘হট সীটে’ বসিয়ে দিয়ে যেতেন! টেবিলে ততক্ষণে অনেক রেফারকৃত রোগির স্বাস্থ্যবীমা বই জমে গেছে। আমি তখন শিমুলিয়া ঘাট থেকে পদব্রজে আসার পথে বাঁশ ঝাড়ের নুয়ে পড়া ছায়ায় মেঠো পথে অবাধে সঞ্চরণশীল হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগলগুলোকে সচকিত করে দিয়ে এসে কিছুটা ধাতস্ত হবার আগেই সিনিয়র মহিলা প্যারামেডিক এসে হাজির; বিষয়, জটিল গাইনি রোগি। এই বিষয়টা কিছুটা ফাঁকিবাজি করে পড়ে আসার ফলে আমি কিছুটা অপ্রতিভ হলেও ‘বিশ্রামগঞ্জে’র স্বাস্থ্যকর্মী আমিনা আপার সাথে পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে কিছু চিকিৎসা দিয়ে, কিছু পরের সপ্তাহে সাভার জিকে’তে দেলোয়ার স্যারের কাছে রেফার করে সাধারণ রোগি দেখতে থাকি। কিছু কিছু জটিল রোগি ফজলু ভাইও সাথে করে নিয়ে আসেন।

শিমুলিয়া থেকে একদিন ফেরার পথে আকাশ অনেক কালো ছিল, অনেক বজ্র বৃষ্টি হচ্ছিল দেখে ঘাটে এসে আর ইঞ্জিন নৌকা পাচ্ছিলাম না। অনেক দেরি করে কেন্দ্রে ফিরেছিলাম। ফিরে দেখি ডা. কাদির ভাই আর ডা. তারিক ভাই আমার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছেন। আমি কর্মজীবনে যেখানেই গেছি, সমস্যায় পড়েছি, একটি মানবিকতায় ঘেরা পরিবেশ পেয়েছি। শুকনো মৌসুমে শিমুলিয়া যেতে হত ধামরাই পর্যন্ত বাসে, তারপর টেম্পো যোগে কিংবা আরেক দফা মুড়ির টিন বাসে – তা আর মনে পড়ে না। শিমুলিয়া যেতে ভাল লাগত। পথে পড়ত সমৃদ্ধ হিন্দুদের প্রাচীন বাড়িঘর, নদীর দু পাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। টের পেতাম শিমুলিয়া যাবার কথা শুনলে সিনিয়র চিকিৎসক শাহজাহান ভাই খুশি হতেন, কেননা তার বাড়ি কাছাকাছিই ছিল। বলে রাখা ভাল, কাজ দিয়ে হাসপাতাল সমন্বয়কারী শাহজাহান ভাইকে তুষ্ট করা কঠিন ছিল; তিনি ছিলেন পারফেকশনিস্ট। শাহজাহান ভাই ইতালি থেকে প্লাস্টিক সার্জারি শিখে আসেন। পরবর্তীতে তিনি ধামরাইতে নিজস্ব ক্লিনিক স্থাপন করেছেন।

পানিশাইল কেন্দ্রটি ছিল অধুনা কাশিমপুর কারাগারের কাছেই; সে আমলে সেখানে বেক্সিমকোর একটি ফ্যাক্টরি ছিল, কারাগার হয়নি। পানিশাইল আর জরুনের ‘ক্লিনিক ডে’ একই দিনে ছিল। আমাকে অনেক দিনই ডা. লিটন ভাই কিংবা ডা. তৌহিদ কামাল ভাই পানিশাইলে নামিয়ে দিয়ে জরুন যেতেন। জরুন ছিল চন্দ্রা আর জয়দেবপুর চৌরাস্তার মাঝামাঝি জায়গায়। জরুনের রোগিদের মধ্যে অনেকেই ছিল শ্রমিক, তখন সেখানে শহরায়ন হচ্ছিল। পানিশাইলে দুপুরের খাবারের মেনু ছিল ডিমের ওমলেট আর ডাল। কবে একবার মোরশেদ ভাইয়ের জন্য ওখানে ভালমন্দ রান্না হয়েছিল বলে তিনি কর্মীদেরকে মৃদু ভর্ৎসনা করেছিলেন বলে তারপর থেকে সবার জন্যেই ডিমভাজি! ইনচার্জ হারুন ছিল দক্ষিণ বঙ্গের মানুষ; মামাবাড়ির কন্ঠস্বর শুনতে পেতাম।

সাটুরিয়াতে ‘ক্লিনিক ডে’ ছিল সপ্তাহে একদিন, সোমবার। আরিচা রোডের শুভযাত্রা বাসে চড়ে, মনে অশুভ আশংকা নিয়ে যেতে হত। এত দূরের পথ মোটর সাইকেল চালাতাম না। অবশ্য সাটুরিয়ার জন্য শাহাদাত ভাই মোটামুটি নির্দিষ্ট ছিলেন। তিনি প্যাথলজি বিভাগ দেখতেন। শাহাদাত ভাই ঠান্ডা ধরণের, মেধাবী মানুষ ছিলেন। জিকে’তে আমার শেষ উপকেন্দ্রের ডিউটি এই সাটুরিয়াতেই ছিল। ততদিনে আটানব্বইয়ের বন্যা চারপাশ ঘিরে আসছে। আমি সাটুরিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে নৌকায় করে সাটুরিয়া উপকেন্দ্রে পৌঁছেছিলাম, কেন্দ্রে তখন ছিল একটি অস্থায়ী ঘাট। সাটুরিয়া দূরের যাত্রা বলে, যেতে পছন্দ করতেন ইরান ফেরত ডা. শাহাবুদ্দিন ভাইও। তার কথা একটু বলে রাখা ভাল। তিনি মাত্র শ্রীপুর কেন্দ্র থেকে জিকে’তে এসেছেন। আমি শ্রীপুর যাব জেনে উনি আমাকে শ্রীপুর কেন্দ্র আর তার ম্যানেজারকে সামলানোর ব্যাপারে প্রচুর টিপস দিয়েছিলেন। আবার আমি যখন শ্রীপুরে তিনি তখন ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে; তখন তার সাথে চিঠিপত্রের যোগাযোগের মাধ্যমে নগর হাসপাতালের হালচাল জেনে নগরে পোস্টিং নেয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হতে থাকলাম। চিঠিগুলো কিন্তু এখনো হারাইনি!

জিকে’তে কোনো দরকারি কাগজ হারালে লাইব্রেরীতে রাখা হুমায়ূন আহমেদের ‘পোকা’ বইটির কথা উল্লেখ করে মোরশেদ ভাইয়ের শ্লেষ এখনো মনে পড়ে। তিনি বলতেন, “সবারই ‘পোকা’ গল্পটি পড়া দরকার!”

লেখক – ডা. মোশতাক আহমদ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কবি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করছেন।

(ধারাবাহিক চলবে…)

আরও নিউজ পেতে পড়ুনঃ ইতিহাসের ডায়েরী সম্মান ও স্বীকৃতি

Gonoshasthaya News Update, Gonoshasthaya News Update, Gonoshasthaya News Update

এই জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − three =

Back to top button