করোনাভাইরাসখোলা জানালা

ভাইয়ের জন্য ভাই, শিল্পপতির মৃত্যু ও কিছু ভাবনা

হাসান আকবর বর্তমানে চিফ রিপোর্টার হিসেবে চট্টগ্রামভিত্তিক স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দৈনিক আজাদী’তে কর্মরত। তাঁর সাম্প্রতিক একটি ফেসবুক পোস্ট বেশ সাড়া ফেলেছে। পজিটিভ নিউজের পাঠকদের জন্য লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

–হাসান আকবর–

পানিভর্তি ড্রাম কিংবা পুকুরে নাক মুখ চেপে ধরলে যেমন হয় ঠিক সেই অবস্থা। অথবা কেউ বালিশ চাপা দিলে যেমন লাগে। এটিই শ্বাসকষ্ট। যেখানে মৃত্যুর দেখা মিলে প্রতি ক্ষণে। করোনা আক্রান্তদের অনেককেই এই ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। খুব কাছ থেকে মৃত্যুকে দেখতে দেখতে যেতে হচ্ছে পরপারে। অচিন শত্রুর থাবায় এই অবস্থা হতে পারে যে কারো, যখন তখন।এই ভয়াল কষ্ট লাঘব করতে পারে ভেন্টিলেশন। আইসিইউ বেডের ওভারফ্লো অক্সিজেনই মানুষের শ্বাসকষ্টের তীব্রতা কমাতে পারে। দিতে পারে শান্তি। করোনা চিকিৎসায় শ্বাসকষ্ট আছে এমন রোগীর একটু শান্তিতে বাঁচা কিংবা মরার অন্য কোন বিকল্প নেই। ‌অথচ এই আইসিইউ-ভেন্টিলেশনই জুটছে না চট্টগ্রামের শত শত রোগীর কপালে। মাত্র দশটি ভেন্টিলেশন বেড নিয়ে যুদ্ধ করছেন জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। কাকে মারবেন-কাকে বাঁচাবেন অবস্থা!! কাউকে একটু স্বস্তি দিতে হলে কাউকে ড্রামভর্তি পানিতে ডোবাতে হচ্ছে। কাউকে শান্তি দিতে হলে কাউকে দিতে হচ্ছে বালিশ চাপা দেয়ার কষ্ট। অচিন্তনীয় এবং অকল্পনীয় এই কষ্টের ভয়াবহতা লিখে বুঝানো সম্ভব নয়। অনুধাবন করাও অসম্ভব। শুধু যার হয় তিনিই বুঝতে পারেন- এক একটি ক্ষণ কত দীর্ঘ হয়! কষ্ট কত তীব্র হতে পারে!!
এবার আরো ভয়াবহ একটি কষ্টের তথ্য দিই। ছোট ভাইকে তীব্র শ্বাসকষ্টে আইসিইউ বেডে নেয়া হয় আগে। ঘন্টা কয়েকের ব্যবধানে বড় ভাইর শ্বাসকষ্ট চরমে উঠে। বাঁচার জন্য আকুলি বিকুলি করছেন তিনি। কিন্তু হাসপাতালের দশটি আইসিইউ-ভেন্টিলেশনের সবগুলোতেই রোগী। সবারই শ্বাসকষ্ট। সবাই একটু অক্সিজেন চান। সবাই একটু শান্তিতে নি:শ্বাস নিতে চান। শান্তিতে বাঁচতে চান। কিংবা মরলেও শান্তিতে মরতে। কার মুখ থেকে ভেন্টিলেশন খুলে কার মুখে দেবেন! সবারই যে বাঁচার আকুতি!! সবারই যে আকুলি বিকুলি!!!
বড় ভাইর কষ্ট বাড়ছে। এক একটি শ্বাস যেন হাজার মন ওজনের এক একটি পাথর। রিং বসানো হার্ট এত ভার সইবে কি করে!!! এক পর্যায়ে ছোট ভাইর ভেন্টিলেশন খুলে দেয়া হলো বড় ভাইকে। তিনি কিছুটা শান্তি পেলেন। কিন্তু ভয়াল যে ধকল গেছে তা আর কাটিয়ে উঠতে পারলেন না। মারা গেলেন।
এটি কোন সাধারণ মানুষের ঘটনা নয়। দেশের শীর্ষ শিল্পগ্রুপ এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের বড় এবং ছোট দুই ভাইয়ের বেলায় ঘটে যাওয়া ঘটনা। বড় ভাই মারা গেলেন। ছোট ভাইকে আবার আইসিইউ দেয়া হয়েছে।
সময়মতো আইসিইউ-ভেন্টিলেশন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এভাবে ঘটনাটি লিখতে হতো না। কিন্তু চট্টগ্রামে আইসিইউ ভেন্টিলেশন সুবিধা পর্যাপ্ত নেই। এস আলম গ্রুপের পরিচালকের বেলায় গতকাল যা ঘটলো ঠিক একই ঘটনা কাল অন্য কোন শিল্পপতির বেলায় ঘটতে পারে। ঘটতে পারে আমার বা আমাদের বেলায়ও। ভয়াল সেই দিনটি কেবলই যেন কাছে আসছে। ধেয়ে আসছে।
এস আলম গ্রুপ চাইলে চোখের পলকে কয়েক হাজার আইসিইউ-ভেন্টিলেশন বেড কিনতে পারতো। পারে। অথচ একটি মাত্র বেডের অভাবে ভয়াবহ কষ্ট নিয়ে তাদের পরিবারের এক অভিভাবক মারা গেলেন। হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাংক, পাওয়ার প্ল্যান্ট, গাড়ি, বাড়ি সহায় সম্পদ সবই যেন অর্থহীন হয়ে গেল।আহা, এই কষ্ট কি প্রাণে মানে!!!!
চট্টগ্রামের মাননীয় শিল্পপতিবৃন্দ, বাড়িতে ঢুকে গেছে বিপদ। কড়া নাড়ছে দুয়ারে। যখন তখন ছোবল মারবে করোনা। এবার কিছু করুন। আরো বহু আগেই করার দরকার ছিল। অনেক কিছু করারও ছিল। করেন নি। করার সময় হয়তো পান নি। কিন্তু আর সময় নেই। এবার কিছু করুন। নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য, নিজের শহরের জন্য সর্বোপরি মানুষের জন্য এগিয়ে আসুন। প্লিজ।

এই জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × one =

Back to top button