আইন ও বিচার

পুঁজি হারিয়ে, প্রতারিত হয়েও কারাবন্দী সাংবাদিক মিজান

একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন ইনচার্জ সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেল বিমামের টিকিটের ব্যবসা করতে গিয়ে টোয়েন্টিফোর টিকিটকাণ্ডে প্রতারণার স্বীকার হয়েছেন। হারিয়েছেন নিজের সমস্ত পুঁজি। এজন্য প্রতারক অংশীদারদের বিরুদ্ধে মামলাও করেছেন তিনি। কিন্তু এই ঘটনায় অন্য আরেকটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘মিজানুর রহমান টোয়েন্টিফোর টিকিটকাণ্ডে কোম্পানিটি থেকে কোনো টাকা নেননি। কোম্পানিটির ডিরেক্টর কাগজে কলমে হলেও কোনোরকম আর্থিক লেনদেন বা কোম্পানি পরিচালনায় মিজানুর রহমান সোহেলের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। কোনো গ্রাহকও তাকে চিনতেন না। কোম্পানি থেকেও তিনি কোনো বেতন-ভাতা কিংবা সম্মানি নেননি। কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকেও তার অ্যাকাউন্টে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়নি।

স্ত্রী সুমাইয়া সিমা এসব তথ্য জানিয়ে তাকে নির্দোষ দাবি করে মুক্তি চেয়েছেন। সিমা জানান, ‘গত এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে মিজানুর রহমান সোহেল খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুর রাজ্জাক ও তার বোন চেয়ারম্যান মোসা. নাসরিন সুলতানা কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ করে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এ সময়ে মিজানুর রহমান সব পরিচালককে সিসিতে রেখে অফিসের হিসাব চেয়ে দুই দফায় এমডিকে মেইল করেন। ফোনেও নানান সময়ে অফিসের হিসাব দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু এর কিছুদিন পরই কোম্পানির এমডি ও চেয়ারম্যান লাপাত্তা হয়ে যান। ফলে মিজানুর রহমান তার বিনিয়োগ করা অর্থও (পুঁজি) হারিয়েছেন।’

নির্দোষ স্বামী সোহেলের মুক্তি দাবি করে সুমাইয়া সিমা বলেন, টোয়েন্টিফোর টিকিট ডটকমের প্রতারক এমডি ও চেয়ারম্যানের খপ্পরে পড়ে কোম্পানির কোনোরকম আর্থিক লেনদেনে জড়িত না থাকলেও এখন কারাগারে রয়েছেন সোহেল।

সোহেল প্রতারণার শিকার হতে যাচ্ছেন, এটা বুঝতে পেরে এ সময় তাদের উকিল নোটিশ পাঠান। তবে কোনো প্রত্যুত্তর পাননি। গ্রাহক কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মামলার আগেই গত ১৯ মে মিজানুর রহমান কোম্পানির এমডি আবদুর রাজ্জাক, চেয়ারম্যান মোসা. নাসরিন সুলতানা ও পরিচালক আসাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে কাফরুল থানায় জিডি করেন।

পরবর্তীতে গত ১ জুন সিএমএম আদালতে ১৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে ওই চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন মিজানুর রহমান। মামলাটি এখন পিবিআইতে (কল্যাণপুর ব্রাঞ্চে) তদন্তাধীন রয়েছে। মূলত মিজানুর রহমান সোহেলের মামলার পর টোয়েন্টিফোর টিকিট ডটকমের গ্রাহক ও সিআইডি মামলা করেন।

মিজানুর রহমানের করা মামলার বিষয়ে পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন পিবিআইয়ে থাকা সোহেলের মামলার তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিষয়গুলো তদন্ত কর্মকর্তা খতিয়ে দেখছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোম্পানির তথ্য ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট থেকে দেখা যাচ্ছে, অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচুর নগদ অর্থ উত্তোলন করা হতো। এমডি তার ব্যাংক লোন, গাড়ির কিস্তি অফিসের অ্যাকাউন্ট থেকে দিয়েছেন। পরিচালকদের অনুমোদন না থাকলেও এমডি প্রতি মাসে পাঁচ লাখ টাকা করে মাসিক সম্মানি নিয়েছেন। নিজের নামে একাধিক ব্যাংক এফডিআরও করেছেন। অফিসের যৌক্তিক কোনো হিসাব এমডি বা অফিস সংশ্লিষ্ট কারও কাছেই নেই।

এ বিষয়ে আরও জানা যায়, এমডি রাজ্জাক পাঁচজনের যৌথ কোম্পানি টোয়েন্টিফোর টিকিটের টাকা তার ব্যক্তিগত কোম্পানি বিডি ট্যুরিস্ট ডিএমসির মাধ্যমে লেনদেন করতেন। অবৈধভাবে নিজের ও বিডি ট্যুরিস্ট ডিএমসির নামে একাধিক ব্যাংক ডিপিএস করেছিলেন। বিডি ট্যুরিস্টের নামে যত লোন ছিল এবং বিডি ট্যুরিস্টের অফিস ও স্টাফ চালানো হতো টোয়েন্টিফোর টিকিটের টাকা দিয়ে। অ্যাভন নামে একটি আইটি ফার্ম করেছিলেন, সেটির টাকাও টোয়েন্টিফোর টিকিট থেকে নিতেন। ইভ্যালিতে তার বড় একটা বিনিয়োগ ছিল, সেই টাকাও টোয়েন্টিফোর টিকিট থেকে নেওয়া। কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য বাইক সার্ভিস দেওয়ার জন্য মোটা অংকের টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন।

টোয়েন্টিফোর টিকিটকাণ্ডে মিজানুর রহমান সোহেলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এসআই সাগর আলী বলেন, বিমানের টিকিট বিক্রির নামে প্রতারণা করে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে অনলাইন এজেন্সি টোয়েন্টিফর টিকিট ডটকম। এ ঘটনায় হওয়া মামলায় টোয়েন্টিফোর টিকিট ডটকমের পরিচালক মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি কোম্পানির মালিকদের একজন। যে মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেটি তদন্তাধীন। তার সংশ্লিষ্টতা কতটা, সেটি এখনই বলা সম্ভব না, তদন্ত শেষ হলে বলা যাবে। মামলা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।

 

এই জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 1 =

Back to top button