প্রকৃতি ও জলবায়ূ

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত হবে সাতজনে একজন

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশে প্রতি সাতজনে একজন বাস্তুচ্যুত হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ দেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে এক কোটি ৩০ লাখ।

সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রণীত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্রে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

নভেম্বরে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠেয় জলবায়ু বিষয়ক ‘কনফারেন্স অব পার্টিস’ সংক্ষেপে কোপ-২৬ সম্মেলনে বাংলাদেশের তরফে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

জো বাইডেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তনের ফলে এবারের জলবায়ু সম্মেলনকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহার করেছিলেন।

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের ৪৭ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

২০১৯ সালের অর্ধবার্ষিকী প্রতিবেদনের হিসাব মতে, দেশের ২৩টি জেলা থেকে প্রায় ১৭ লাখ মানুষকে স্থানান্তরিত হতে হয়েছে। এর বেশিরভাগই ঘটেছে বিভিন্ন উপকূলীয় জেলাগুলোতে, যেমন ভোলা, খুলনা ও পটুয়াখালী। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বাস্তুচ্যুতির মূল কারণ জোয়ারের পানির উচ্চতাবৃদ্ধি, যা উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যা ঘটায়। বাস্তুচ্যুতির মাধ্যমিক কারণ হিসাবে গ্রীষ্মকালীন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি দুর্যোগের এসব প্রক্রিয়ার আরও অবনতি ঘটাতে পারে। ২০৮০ সালের মধ্যে তলিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৩ শতাংশ ভূমি।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির অনুমেয় সবচেয়ে গুরুতর ফল হলো চাষযোগ্য জমি, মাটি এবং পানিতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ এবং তার পরিণতিতে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব। এটি উপকূলীয় অঞ্চলে বাস্তুচ্যুতির অন্যতম বড় কারণ।

বিষয়টি সম্পর্কে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. তাসনীম সিদ্দিকী বলেছেন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটছে।

লিঙ্গ, জাতিগত, ভৌগোলিক অবস্থান এবং কর্মসংস্থানের ধরনের ওপর ভিত্তি করে বাস্তুচ্যুতির প্রভাব নির্ধারণ হবে। এ ব্যাপারে নীতি নির্ধারণে সব গ্রুপকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মেগাসিটির ধারণা থেকে সরে গিয়ে গ্রোথ সেন্টারভিত্তিক বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।

জাতীয় কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয় যে, মূল ভূখণ্ড এলাকায় বাস্তুচ্যুতি ঘটানোর মূল কারণ নদীভাঙন ও বন্যা। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় নিয়মিত খরা হয়। এটাও বাস্তুচ্যুতি ঘটায়। ভূতাত্ত্বিকভাবে কয়েকটি সক্রিয় ভূ-চ্যুতির মধ্যে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ উচ্চমাত্রায় ভূমিকম্পের ঝুঁকিপ্রবণ দেশ।

ভারতীয় টেকটোনিক প্লেটের উত্তরপূর্ব কিনারে বাংলাদেশের অবস্থান। সক্রিয় সাবডাকশন জোন ও মেগা থ্রাস্ট ফ্রন্টের কারণে এ অঞ্চলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি আগের ধারণার চাইতেও বেশি হতে পারে। ভূমিকম্পও শহর ও উপশহরগুলোতে বড় আকারে বাস্তুচ্যুতি ঘটাতে পারে। কৌশলপত্রে বাস্তুচ্যুতিরোধ, বাস্তুচ্যুতির সময় মানুষকে রক্ষা করা এবং বাস্তুচ্যুতি পরবর্তিতে স্থায়ী সমাধান করার প্রতি জোর দেয়া হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বেশ কিছু সুপারিশ কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে যেমন : ক্ষয়ক্ষতি তহবিল, অভিযোজন তহবিল, সবুজ জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহ করা।

এ জন্যে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে একটি তহবিল সংগ্রহ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা। স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের অধীনে আলাদা বাজেট বরাদ্দ করা। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় শ্রমবাজার বিবেচনায় রেখে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অকৃষি খাতে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ অংশীদারির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করা। রেমিট্যান্স প্রেরণকে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বাস্তুচ্যুতিপ্রবণ এলাকাগুলো থেকে পরিবারের এক বা একাধিক সদস্যের জন্য স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসনের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

কৌশলপত্র বাস্তবায়নে অর্থায়নের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে দুর্যোগ বিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি-২০১৯ অনুযায়ী বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন বহুপাক্ষিক এবং দ্বিপাক্ষিক দাতা সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।

এই জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + eight =

Back to top button